নববর্ষ হোক মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়
করেনা আতঙ্ক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অমানবিক ঘটনাগুলো সবাই জানি, কমবেশি। হাসপাতাল থেকে হাসাপাতালে ঘুরে জায়গা পেলেন না। মারা গেলেন মুক্তিযোদ্ধা আলমাছউদ্দিন। মারা গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন চাকমা। তাদের কারও কিন্তু করোনা ছিল না।
নারায়ণগঞ্জে রাস্তায় পড়ে থেকে মারা গেলেন গিটারিস্ট হীরু। কেউ কাছে এগিয়ে আসলেন না। এ্যম্বুলেন্স চালক পালালেন ভয়ে। হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে পথেই সন্তান প্রসব করলেন এক মা। দাফনের জন্য নিজের বাড়ি বা শ্বশুরবাড়িতে সামান্য মাটি পেলেন না নওগাঁর এক নারী। দাফনের জন্য খাটিয়া পেলেন না সুনামগঞ্জের এক পুরুষ। বরিশালে মারা গেলেন এক ব্যক্তি যার আগে থেকে যক্ষ্ণা ছিল। অ্যাম্বুলেন্স ডাকার জন্য কিংবা মৃত্যুর পর দাফনের জন্য তিনি নিকটবর্তী প্রতিবেশী বা আত্মীয় কাউকে পেলেন না। তাকে দাফন করতে বরিশাল শহর থেকে ছুটে গেলেন কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক।
এই ঘটনাগুলো না দেখলেই বরং ভাল হত। হয়তো এসব নিয়ে না লিখলেই ভাল হত। তবু যদি কেউ আরেকটু সোচ্চার হন বিষয়গুলো নিয়ে সেই আশায় লেখা। মানুষ আতঙ্কে অস্থির হয়ে নিজের ন্যূনতম কর্তব্যজ্ঞান বিস্মৃত হয়েছে। সতর্কতা যখন নিজ দায়িত্ব থেকে ফিরিয়ে রাখে তখন আর সেটা সচেতনতা থাকে না। হয়ে যায় স্বার্থপরতা। সচেতনতার নামে এখন চূড়ান্ত স্বার্থপরতা দেখছে বাংলাদেশ। এ দেশ আমার পরিচিত নয়। এ দেশ কখনো দেখিনি আগে।
সব দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে ঘরে বসে পেটের মধ্যে হাত পা ভরে রেখেছে একটি শ্রেণী। নিজেরা অন্যের সেবায় বের হচ্ছেন না, অন্যকেও বের হতে বাধা দিচ্ছেন নানাভাবে। কখনো রাস্তায় অবিবেচক অননুমোদিত ব্যারিকেড ফেলে, কখনো কথায় ও লেখায়, কখনো যানবাহনের চলাচলে মাত্রাতিরিক্ত বিধি নিষেধ আরোপ করে। অথচ জরুরি অনেক খাত আছে যেসব জায়গায় কাজ করার ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে অনুমতি দেয়া আছে সরকারের তরফ থেকে।
এখন সরকার কি আইন করে মানবিকতা তৈরি করবে? নাকি আইন করে মানবিকতা তৈরি করা সম্ভব? এই অমানবিক মানুষের মাঝে, এই স্বার্থান্ধ সময়ে বাঁচার চেয়ে বরং করোনায় মরে যাওয়া ভাল ছিল। কথাগুলো একান্ত মনের কথা একজন সমাজকমীর। তার লেখার মধ্যে থেকে সত্যিই তো মানবতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে? যদি তাই হয় আমাদের মানবতা কি তাহলে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বানে?
না উল্লেখিত ঘটাগুলোকে আমরা আর দেখতে চাইনা। আমাদের জাতিগত পরিচয় মানবিক সেটা হারাতে চাইনা। আমাদের জাতি মায়ের ভাষার জন্য প্রান দিয়েছে । স্বাধীনতার জন্য তিশ লক্ষ শহীদ হয়েছেন। এরপর নানা সময়ে একের পর এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বিভিন্ন সংকট কালে। এরকম অনেক ঘটনা আছে যা বাঙালীকে মানবিক বাংলাদেশ বলার অহরহ যুক্তি আছে।
চাঁদপুর শহরের কোড়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সবুজ মাঠ। সেখানেই তৈরি করা হচ্ছিল শত শত বৃত্ত। তখনো উত্সুক এলাকাবাসী জানত না, লাঠি-অস্ত্র ফেলে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য কেন ওই স্থানে এমন অদ্ভুত কাজ করছে। এমন কাজের পর দুপুরে আরেক দল পুলিশ সেখানে এসে হাজির! আশপাশের এলাকায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় পুলিশ খুঁজে বের করে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ঘরে আটকা পড়া ৩০০ পরিবারকে। যারা খুব কষ্টে মানবেতর জীবন যাপন করছে। একসময় মাঠে তৈরি করা বৃত্তের মধ্যে অবস্থান করতে তাদের ডাক পড়ে। নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তাদের দাঁড়াতে বলা হয়।
পরে পুলিশ সদস্যরা এসব দুস্থ ও অতিদরিদ্র মানুষের হাতে তুলে দেয় খাদ্য সহায়তা। আর তা পেয়ে দারুণ খুশি চাঁদপুরের মেঘনাপারের তিন শতাধিক পরিবার। জেলা পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুর রহমান মানবিক এ উদ্যোগ প্রসঙ্গে বলেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে পুলিশের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে অতিদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষুদ্রপ্রয়াস।
করোনা পরিস্থিতিতে ৫৫ হাজার বর্গমাইলের মানচিত্রটাই এখন মানবিক বাংলাদেশ। চাঁদপুর পুলিশের মতো দেশজুড়ে এভাবেই চলছে খাদ্য সহায়তা। ব্যক্তি উদ্যোগ, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি সবাই দুস্থদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাদ্যসামগ্রী। এসব খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে চাল, ডাল, তেল, লবণ ও আলু। একই সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে সাবান, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও জরুরি ওষুধ।
এতো গেলো তত্ত্বকথা আর বাস্তবতার প্রতিচ্ছেদ। এই মরণঘাতী ভাইরাসের বিরুদ্ধে কিভাবে লড়ছে মানুষ বা কিভাবে ক্রমশ জয়ী হচ্ছে তা নিয়ে কথা হচ্ছে, লেখাও হবে হয়ত ইতিহাসে পাতায় না ভাবে উপস্থাপন হবে। বরং চলুন একটু বোঝার চেষ্টা করি যে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কালে আমাদের আর কিছু কি চোখে পড়ছে? অনেকেই বলছেন যে বিশ্বে অনেকগুলো যুদ্ধ থেমে গেছে, হানাহানি থেমে গেছে।
আদতে কি থেমেছে, থামেনি। আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, চাদ, মালি বা নাইজেরিয়ায় প্রতিদিন মানুষ মরছে এখনো। তবে অন্য কিছু পরিবর্তন কিন্তু একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়বে আমাদের। আর সেসব পরিবর্তনগুলো বেশ চমকপ্রদও বটে। আমেরিকা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চাচ্ছে উত্তর কোরিয়ার দিকে, অন্য রাষ্ট্রগুলোও একে অন্যকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, সার্কে তৈরি হয়েছে করোনা ভাইরাস মোকাবেলা যৌথ তহবিল। অনেক মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ হবার প্রয়াস দেখছি আমরা চারদিকে।
আবার অবাক হয়ে এটাও দেখছি যে প্রথম বিশ্বের দেশে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ যুদ্ধের কারিগরি ও অভিজ্ঞতা জ্ঞান সম্পন্ন মেডিকেল দল পাঠাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশ চীন, যখন আমরা উল্টোটা দেখে অভ্যস্থ ছিলাম এতোদিন। একই সাথে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে বাধ্য করছে নিজেদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কিছুটা হলেও সংহত ও শক্তিশালী করতে। এতে করে স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বেড়েছে যা বহু অ্যাডভোকেসিতেও বাংলাদেশে পারা যায়নি গত দুই দশকে।
এর ফায়দা হয়তো বিশেষ করে ধনিক ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি পাবে বা নেবে কারণ তাদের স্বাস্থ্যের সেবা নেয়ার অন্যতম ভরসাস্থল প্রথম বিশ্বের স্বাস্থ্যসেবাই করোনার আক্রমণের ধাক্কা সামলাতে পারেন, প্রতিরোধও করতে পারছে। তারপরও আম-জনতা কিছুটা হলেও এখনকার চেয়ে একটু বেশি সুবিধা পাবে। সেটা কতটা নারী বান্ধব হবে বা শিশু ও বৃদ্ধ বান্ধব হবে তা বলা মুশকিল।
তবে সবচেয়ে বড় কথা, এই ভাইরাস আমাদের দৈনন্দিন অনেক অভ্যাসকে অনেকটা বদলে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। আমাদের দেশের একটা অংশের মানুষের রাস্তায় যেখানে সেখানে কফ থুথু ফেলা ও মূত্র ত্যাগ করার যে অভ্যাস তা অনেকটা কমে যাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ সীমিত করার জন্য রাষ্ট্র আরোপিত স্বেচ্ছা-নির্বাসনের নিয়মে নাগরিকরা যে অবরুদ্ধ জীবন যাপন করছে সেই জীবনে তৈরি হচ্ছে নিয়মিত হাস ধোয়া ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাস। চলমান সংকট আরও সুদীর্ঘ হতে পারে এই আশংকায় মধ্যবিত্তের ঘরে তৈরি হচ্ছে সংযমী খাওয়া দাওয়া ও খাদ্য অপচয় না করার অভ্যাস।
অনেকের মখে শুনি যে সবাই এখন বাসায় বন্দী থাকায় পুরুষরা কিছুটা হলেও ঘরের কাজে হাত লাগাচ্ছে। সেটা হয়তো যতটা না কাজ বন্টনের সূত্রে, তার চেয়ে বেশি সময় কাটানোর প্রয়াসে। তবে সামাজিকীকরণের তত্ত্বগত সূত্র বলে যে যদি কোন কিছু নিয়মিত অভ্যাস করানো যায় তবে সেই অভ্যাসের বলে তা পরেও চলমান থাকে মানুষের মধ্যে। তো, এই অব্রুদ্ধ জীবন যদি আরও কিছুদিন চলে তবে হয়তো কিছু পুরুষের মধ্যে ঘরের কাজের অংশ নিজের করে নেবার অভ্যাস তৈরি হতেও পারে। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোও চারপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও জীবানুমুক্ত রাখার জন্য অন্তত শহরগুলোতে সর্বাত্বক প্রয়াস চালাচ্ছে যা বহু আবেদন নিবেদনেও এতোদিন কানে নেয়নি দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো। এই করার অভ্যাস হয়তো সংস্থাগুলোর থেকেও যেতে পারে কোন সুচিন্তাশীল নেতৃত্বের ছত্রছায়ায়।
সার্বজনীন বাংলা নববর্ষ ১৪২৭ আমাদের দ্বারে। পুরনো, জরাজীর্ণ এবং অশুভকে পেছনে ফেলে নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে চলতে পহেলা বৈশাখ আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায়। ব্যর্থতার গ্লানি মুছে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উজ্জ্বল আলোর রথে চলতে শেখায়। তাই, পহেলা বৈশাখ বাঙালীর মহা ঐক্যের দিন। ধর্ম, বর্ণ, জাত বা গোত্রের সীমারেখা ভেঙে পহেলা বৈশাখের উৎসব আয়োজন আমাদের এক পথে চলতে সাহসী করে। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা বর্তমানে সৃষ্ট কোরনা সংকট দ্রুত কেটে যাক। নুতন আলোয়ে আলোকিত হোক পৃথিবী।
যে আঁধার আমাদের চারপাশকে ঘিরে ধরেছে, তা একদিন কেটে যাবেই এই আশায় আসনু আমারা এই সংকট কালে এই কঠিন যুদ্ধে আমরা প্রত্যায় করি আর একটি মুক্তিযুদ্ধের । আর এই যুদ্ধের মাধ্যে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলি। এই সামাজিক দুরত্বের সময়ে আমরা আমাদের মনুষত্বের বিকাশ করি।
