• আজঃ বৃহস্পতিবার, ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৯শে অক্টোবর, ২০২০ ইং
  • English
ব্রেকিং নিউজঃ

বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন: আলোর কারিগরের জীবন বদলে দেওয়া দুর্ঘটনার গল্প

টমাস আলভা এডিসন ১৮৫৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ওহিওর ছোট্ট শহর মিলানে জন্মগ্রহণ করেন। সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট এডিসন ছেলেবেলায় ‘আল’ নামে পরিচিত ছিলেন।

শৈশবে প্রাণোচ্ছল এই ছেলেটিকে সবসময় প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাপকাঠিতে বেশি দূর আগাতে পারেননি তিনি।

আধুনিক যুগের ঐতিহাসিক ও চিকিৎকগণ নিশ্চিত করেছেন এডিসন মনোযোগহীনতা বা হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার বা এডিএইচডি’তে ভুগে থাকতে পারেন।

প্রাক্তন স্কুল শিক্ষিক মা তাকে বাড়িতেই পড়িয়েছেন। আর বাবার ছোট লাইব্রেরিটি তার মধ্যে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে।

শৈশব থেকেই বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। ঘরে বিভিন্ন পরীক্ষা- নিরীক্ষার কাজ করে সময় পার করতেন তিনি। অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনায় খুব ছোট বয়সেই শ্রবণ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে তার।

কিন্তু তিনি কখনো একে তার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেননি। বরং তিনি মনে করতেন এ কারণেই কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই কাজে মনোযোগ দিতে সক্ষম হয়েছেন।

১৮৫২ সালে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রেলপথটি পোর্ট হিউরনের ১০০ মাইল দূরে ডেট্রয়েট শহরের সাথে সংযোগ স্থাপন করার জন্য একটি স্টেশন নির্মাণ করা হয়। তরুণ ‘আল’ ট্রেনে মিছরি, সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন বিক্রির কাজ নিলেন।

সপ্তাহে বেশ কয়েকবার ডেট্রয়েটের দিকে যেতে হতো তাকে। অবসর সময় তিনি ডেট্রয়েটের পাঠাগারে বই পড়ে সময় কাটাতেন।

এ সময় নিজের একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেন এডিসন। যার মাধ্যমে পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আয় এবং শখ পূরণের প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দিতেন তিনি।

এডিসনের আগ্রহের বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ। এটি দীর্ঘ পথে বার্তা প্রেরণে ব্যবহৃত হতো।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় রেলপথগুলোর ক্রিস-ক্রসিংয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বার্তা আদান-প্রদান। সেকালে দূরে বার্তা আদান-প্রদানের জন্য টেলিগ্রাফই ছিল একমাত্র ভরসা।

গ্র্যান্ডট্রাঙ্ক রোডে ঘনঘন যাতায়াতের কারণে এডিসনের পরিচয় হয় জেমস ইউ ম্যাকেনজির সাথে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে তার সাথে।

তিনি ছিলেন মাউন্ট ক্লিমেন্সের স্টেশন মাস্টার এবং টেলিগ্রাফ অফিসার। ১৮৬২ সালে ১৫ বছর বয়সে এক আগস্টে এডিসন দাঁড়িয়ে ছিলেন মাউন্ট ক্লিমেন্স স্টেশনের বাইরে, যেখানে মালবাহী গাড়িগুলো থেকে মালামাল সাইড ট্র্যাকে স্থানান্তর করা হচ্ছিলো।

এডিসন হঠাৎ লক্ষ্য করলেন ম্যাকেনজির দুই বছরের ছেলে রাস্তায় খেলা করছে এবং একটি গাড়ি দ্রুত বেগে তার দিকে এগিয়ে আসছে।

এডিসন লাফ দিয়ে বাচ্চাটাকে তুলে নিলেন। ছোটোখাটো ক্ষত ছাড়া দুজনের তেমন কোনো ক্ষতি হলো না। আর এই ঘটনাটি ঘুরিয়ে দিলো এডিসনের জীবনের মোড়।

পুত্রের জীবন রক্ষা করার জন্য কৃতজ্ঞ ম্যাকেনজি তার পরদিন এডিসনকে মোর্স টেলিগ্রাফ সিস্টেম শেখানোর প্রস্তাব করেন। এডিসন সানন্দে রাজি হয়ে যান। যথেষ্ট কাজের চাপ থাকা সত্ত্বেও সমস্ত অবসর সময় কাটাতে লাগলেন টেলিগ্রাফ শেখায় এবং কাজ শেষ করে বাড়ি যাওয়ার সময়ও অনুশীলন করতেন।

অল্প কয়েক মাসের মধ্যে এডিসন কঠিন মোর্স সিস্টেমে দক্ষ হয়ে উঠেন। এই সিস্টেমে অপারেটরকে দ্রুত শব্দ এবং বাক্যাংশগুলোকে সংক্ষেপ কোডে রূপান্তরিত করতে হতো এবং সংক্ষিপ্ত কোড থেকে তার অর্থ উদ্ধার করতে হতো।

সেসময় টেলিগ্রাফ অপারেটর পেশা হিসেবে অনেক উচ্চাভিলাষী যুবকেরই প্রথম পছন্দ ছিল।

১৮৫০ এর দশকে, অ্যান্ড্রু কার্নেগি মহাকাশচারী এবং শিল্পপতি হওয়ার আগে টেলিগ্রাফ অপারেটর হিসেবে তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন।

পরবর্তী ছয় বছর এডিসন ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন টেলিগ্রাফ কোম্পানির হয়ে কাজ করেছেন।

কাজের সূত্রে তাকে মধ্যপ্রাচ্যের শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। বার্তা পাঠানো এবং গ্রহণে এই সময়েই এডিসন বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে সমর্থ হন।

কিছু দিনের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট বার্তাবাহক ও সাংবাদিকদের জন্যও কাজ করেছেন। যার মাধ্যমে সাংবাদিকদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এডিসন। যা পরবর্তীকালে তার ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এছাড়া তিনি তার বাকি সময় পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজে ব্যয় করতেন। এই সময়টাতে তিনি বিদ্যুৎ ও তার সম্ভাব্য ব্যবহারের উপর মনোনিবেশ করেছিলেন।

১৮৬৮ সালে তিনি বোস্টন চলে যান এবং পরের বছর জানুয়ারিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের জন্য জীবনের প্রথম পেটেন্ট অর্জন করেন।

প্রথম দিকে মোর্স টেলিগ্রাফে লিখিত বার্তা প্রেরণ করা হলেও ততদিনে অডিও সিগন্যাল পাঠানোর প্রযুক্তি চালু হয়ে গিয়েছিল।

ছেলেবেলা থেকেই এডিসন কানে কম শুনতেন তাই তার জন্য টেলিগ্রাফ অপারেটর হিসেবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি কাজ ছেড়ে দিয়ে নিউইয়র্কে চলে যান এবং গবেষণায় পুরো সময় ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেন।

বন্ধু ম্যাকেনজি থেকে যে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন সেটিই এডিসনকে তার প্রথম আর্থিক সাফল্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

১৮৭৪ সালে তিনি একটি উন্নত ‘কোয়াড্রুপ্লেক্স’ সিস্টেম গড়ে তোলেন যা একটি টেলিগ্রাফ লাইনে চারটি আলাদা সংকেত প্রেরণ করতে পারতো।

ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ১০,০০০ ডলারের (বর্তমান মূল্য ২১৫,০০০ এরও বেশি) বিনিময়ে এই কোয়াড্রুপ্লেক্স সিস্টেমের স্বত্ব কিনে নেয়।

এই অর্থ ব্যবহার করে এডিসন নিউ জার্সির মেনলো পার্কে তার প্রথম পরীক্ষাগার নির্মাণ করেন। এই পরীক্ষাগারে বহুদিন তিনি কাজ করে গেছেন

এবং তাকে ডাকা হতো ‘মেনলো পার্কের জাদুকর’ নামে। এখানেই জন্ম হয়েছে ফোনোগ্রাফ, বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর বৈদ্যুতিক বাতি এবং শত শত আরো অনেক বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত আবিষ্কার।

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

October 2020
FSSMTWT
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031