মাগুরার দুই গ্রামে শুধু কান্না আর আহাজারি, অনাহারে নারী-শিশুদের দিন কাটছে আতংকে
রবীন শরীফ, মাগুরা, বাংলাদেশ গ্লোবাল : গ্রাম্য সামাজিক দলাদলির কোন্দলে মাগুরা সদরের নন্দলালপুরসহ দুইটি গ্রাম জুড়ে শুধু কান্না আর আহাজারি।
হামলা-মামলায় পুরুষ শুন্য গ্রামের অনাহারী নারী শিশুদের দিন কাটছে চরম আতংকে। এক দিকে নিহতের পরিবারে স্বজন হারানোর শোক।
অপর দিকে হত্যা পরবর্তি সহিংসতায় হামলা ও ভাঙচুর লুটাপাটের কারনে সহায় সম্বল হারানো মানুষের কান্না আর হাহাকার। হামলা-মামলার ভয়ে মানুষ শুন্য গ্রামটি এক আতংকের জনপদ।
মধ্যযুগীয় বর্ববরতায় ধংসস্তুপে পরিনত গ্রামেটিতে বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে অনাহারে চরম আতংকে দিন কাটাচ্ছে নারীরা। পাল্টে দিয়েছে গ্রামের স্বাভাবিক চিত্র।
ঘটনা মাগুরা সদর উপজেলার নন্দলালপুর গ্রামের। গত ১৬ নভেম্বর গ্রাম্য সামাজিক দলিয় কোন্দলে জাকির হোসেন লিটনকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ শরিফুল মোল্যার সমর্থকরা।
তারপর থেকেই বাড়িঘরে হামলা ভাংচুর, লুটপাট আর মামলার আতঙ্কে গ্রামের সাধারণ জীবন যাত্রা বদলে গেছে পুরোটাই।
জনমানবহীন শুন্য ঘরবাড়ি দেখলে মনে হয় যেন যুদ্ধবিদ্ধস্ত কোন জনপদ। প্রতিপক্ষের হামলা আর মামলার ভয়ে পুরুষ শুন্য গ্রামে এখন শুধুই কান্না আর আহাজারি।
একদিকে হত্যার শিকার লিটনের পরিবারে চলছে স্বজন হারানো শোকের মাতম অপর দিকে হত্যার ঘটনার পর প্রতিপক্ষের হামলা, ভাংচুর লুটাপাটের শিকার সহায় সম্বল হারানো পরিবার গুলির কান্না আর হাহাকার।
পুরুষ শুন্য নন্দলালপুর গ্রাম এখন এক আতংকের জনপদে পরিনত হয়েছে।
সরেজমিনে গ্রামটি ঘুরে দেখা যায়, নিহত লিটনের পরিবারে স্বামীর ছবি বুকে ধরে বসে আছেন স্ত্রী হেলেনা বেগম।
ঘটনার সময় স্বামীকে রক্ষা করতে নিজের জীবন বাজি রেখে আহত লিটনকে আগলে রাখতে চেষ্টা করেন তিনি। তবু রক্ষা করতে পারেননি প্রিয় স্বামীর জীবন।
দুর্বৃত্তদের আঘাতে নিজেও আহত হয়েছেন। আহত অবস্থায় হাসপাতালে দুই দিন ভর্তি থাকার পর বাড়ি ফিরে শুধু স্বামীর শোকে আহাজারি করছেন।
চোখের সামনে স্বামীকে নির্মম ভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার বর্ননা করতে গিয়ে বার বার মুষড়ে যান তিনি।
পাশেই লিটনের মা ও বোনদের পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান হারানোর কান্না।
সন্তান হারানো শোকে হতভম্ব ঝিনাইদহের একটি মসজিদের ইমাম বৃদ্ধ বাবা মুনসুর আহমেদ। সন্তানের মৃত্যু মানতে পারছেন না। বলছেন তার মত এভাবে আর কোন বাবার বুক যেন খালি না হয়।
অপরদিকে, হত্যাকান্ডের পর প্রতিপক্ষের বর্বরচিত হামলা ভাংচুর, লুটাপাটের শিকার হয়ে সহায়, সম্বল হারানো সর্বশান্ত পরিবারের মানুষ গুলির কান্না আর হাহাকার। ঘটনার পর পরই হামলা মামলার ভয়ে পুরুষেরা গ্রাম ছেড়ে অনত্র পালিয়ে যান।
২৫ থেকে ৩০টি বাড়িতে সহিংস হামলা চালিয়ে বাড়িঘর, দোকান ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও টাকা, স্বর্ন, চাল, ডাল, গরু, ছাগলসহ মুল্যবান সব মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। সাথে মামলার ভয়ে পুরুষ শুন্য গ্রামের গুটিকয়েক বাড়ির নারী ও শিশুরা রয়েছেন চরম নির্যাতন অতংকে।
বাড়ির বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে অনাহারে অসহায় দিন কাটাচ্ছেন নারীরা।
হাজিপুর, শ্রীরামপুর পার্শবর্তী জেলা ঝিনাইদহের হাটগোপালপুরসহ আশেপাশের এলাকার নিকট আত্বীয়দের বাড়ি হতে পাঠানো খাবারের অপেক্ষায় খেয়ে না খেয়ে এক প্রকার মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা।
খাদ্যদ্রব্যসহ সংসারের সরঞ্জামাদি বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই, সব লুট করে নিয়েছে দুর্বিত্তরা।
এক আতংকের জনপদে পরিনত নন্দলালপুর গ্রামটির চারদিকে শুধুই কান্না আর আহাজারি।
প্রায় একই চিত্র পাশের সাচানী গ্রামেরও। সেখানে গত ১ নভেম্বর প্রতিপক্ষের লোকেরা মাছুদ মোল্লা নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করে।
এরপর থেকেই গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর আর লুটপাট চালানো হয়। এখন মামলায় গ্রেপ্তারের ভয়ে পুরুষ শূন্য গোটা গ্রাম।
যদিও এ ব্যাপারে মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিন বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক। ঘটনার পর থেকেই সহিংসতা এড়াতে গ্রামে সার্বক্ষনিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আর দোষীদের গ্রেপ্তার চেষ্টা অব্যাহত আছে।
উল্ল্যেখ, জেলা জুড়েই গ্রাম্য সামাজিক দ্বন্দ্ব, কোন্দলে সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত সংঘাত, হত্যাকান্ড, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ লুটাপাটের ঘটনার অপসংস্কৃতি যুগযুগ ধরে চলমান ।
এই সহিংসতার কারনে স্বজন হারা, সহায় সম্বল হারা হাজারও পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ অসহায় জীবন যাপন করছেন।
গ্রামের সাধারন জীবন যাত্রার চিত্র পাল্টে গেছে পুরোটা। এ অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে।
আধুনিক সভ্যতার যুগে এই মধ্যযুগীয় বর্বরতায় হামলা, ভাংচুর, লুটাপাটের অপসংস্কৃতি থেকে মুক্তি চায় ভূক্তভোগী পরিবার, সচেতন জেলাবাসী।
