ব্রেকিং নিউজঃ

কঠিন এক সময়ের মুখোমুখি পৃথিবীর মানুষ

করোনাভাইরাস মহামারীর প্রকোপে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে বিশ্বে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংস্থাগুলো হচ্ছে, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা।

কারণ হিসেবে বলছে, করানো ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের চেষ্টা হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রতিটি দেশের সরকারই তাদের দেশে লকডাউন, কোয়ারেন্টিনসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছে।অন্যদিকে করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট শঙ্কার মধ্যে বাংলাদেশও এর বাহিরে নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বর্তমানে করোনাভাইরাসে প্রায় ২০০টির বেশি দেশ ও অঞ্চল আক্রান্ত হয়েছে। এবং বিশ্বজুড়ে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৮৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই মরণঘাতি ভাইরাস এখানেই থেমে নেই প্রতিদিনই হু হু করে বেড়েই চলেছে।করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশেগুলো হল যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, চীন, স্পেন, জার্মানি, ইরান ও যুক্তরাজ্য।

বিশ্ব যে একটি গ্লোবাল ভিলেজ এমন ধারণা এ মুহূর্তে অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। করোনায় আক্রান্ত প্রায় সব দেশই নিজেদের জনগণকে সুরক্ষা দিতে নিয়েছে সংরক্ষণশীল পদক্ষেপ। অর্থাৎ অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। এছাড়া করোনার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্যে। বিশ্বব্যাপী আমদানি-রফতানি হ্রাস পাচ্ছে। ফলে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বে ভয়াবহ যে মন্দা, তার শুরুটা হয়েছিলো ১৯২৯ সালে, সমাপ্তি আসে ১৯৩৯ সালে। কেউ কেউ অবশ্য এর সমাপ্তি টেনেছেন ১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে। তাহলে কম হলেও এই মন্দার স্থায়িত্ব ছিলো ৩৩ মাস। এই ৩৩ মাসে ইউরোপ-আমেরিকা চরম বিপর্যয়ে কাতরাতে থাকে।

চারভাগের এক ভাগ মানুষ হয়ে যান বেকার। বৈশ্বিক জিডিপি কমে যায় শতকরা ২৭ ভাগ। উৎপাদনে নেমে আসে স্থবিরতা।কলকারখানা হয়ে যায় বন্ধ। আয়ের পথ হয়ে যায় রুদ্ধ। অনাহার যায় বেড়ে। ক্ষুধা ও অভাবে মারা যেতে থাকে লোকেরা। শুধু আলু খেয়ে জীবন কাটাতে থাকে অধিকাংশ মানুষ।

আমেরিকা সেই মন্দা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলো প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নেতৃত্বে। নিউ ডিল কর্মসূচীর মাধ্যমে আমেরিকা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলো। সঙ্কট থেকে বেরিয়ে এসেছিলো ইউরোপ। এই যে মহামন্দা, সেটা কিন্তু এতো ব্যাপক ছিলো না। তার চরিত্র ছিলো না সর্বগ্রাসী। এখন যে মন্দার পদধ্বনি শুনা যাচ্ছে, সে হবে স্বভাবতই আরো ভয়াবহ। মন্দাটা আসছে বা আসবে, ব্যাপারটা এমন নয়; মন্দা এসে গেছে।

আমরা করোনার হুমকিতে আছি, এটা যতোটা সত্য, দুনিয়া এখন মন্দায় আছে, এটাও সমান সত্য। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, মহামারির পীঠে ছোট-বড় মন্দা-দুর্ভিক্ষ সওয়ার হয়ে থাকেই। ইউরোপের ইতিহাস এর জ্বলন্ত দলীল। কারণ মহামারির অভিজ্ঞতা সবচে বেশি সঞ্চিত আছে এ মহাদেশের অতীতে। সেই ৪৩০ খ্রিষ্টপূর্বে আমরা দেখি, গ্রিসে দ্য প্লেগ অব এথেন্স। যাকে বলা হয় প্লেগের পয়লা মহামারি। এ মহামারি হাজার হাজার গ্রিক সৈন্যের মরণ এনেছিলো! শুধু তাই নয়, এনেছিলো গণমৃত্যু ও অনাহার।

অনেকের মতে প্লেগ নয়, এ সর্বনাশের জন্য দায়ী ছিলো গুটিবসন্ত, জ্বর ও টাইফয়েড! এটি ছড়িয়ে দেয় যে ভাইরাস,তার নাম ভেরিওলা। যা হত্যা করে শহরের শতকরা বিশ ভাগ জীবন। এর পরে এথেন্স অভাবে, বিপন্নতায় ভোগে বহুদিন। মাথা তুলতে লেগে যায় অনেক সময়। রোমান আমলে ইউরোপ দেখেছে বড় বড় মহামারি। এগুলোর অন্যতম ছিলো দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান। ৫৪১ সালে এ প্লেগ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দেয়।

সাথে করে নিয়ে আসে অভাব, গণমৃত্যু, অনাহার। একই সময়ে মিশরে চলছিলো মৃত্যুর মিছিল। প্লেগ অব ইজিপ্ট। দুনিয়ার ইতিহাস বদলে দেয় এ বিপর্যয়। ৫৪০-৫৪১ খ্রিস্টাব্দে এ মহামারি ছড়িয়ে পড়ে ইঁদুরের মাধ্যমে। মিশর থেকে খাদ্য শস্য যেতো ইউরোপে।কনস্টান্টিনোপলে প্লেগের কালো হাত বিস্তৃত হয় ভয়ালভাবে। ক্রমেই বেড়ে চলছিলো তার বিস্তার। এক পর্যায়ে প্রতিদিন প্লেগে মারা যেতো গড়ে ৫০০০ মানুষ।

কোনোভাবেই থামছিলো না এ মহামারি। প্রায় পঞ্চাশটি বছর সে ইউরোপকে মৃত্যুপূরী বানিয়ে রাখে। কেড়ে নেয় কমপক্ষে আড়াই কোটি মানুষের প্রাণ। নিহতের সংখ্যাটা অনেক ঐতিহাসিকের কাছে অনেক বেশি- প্রায় দশ কোটি। প্লেগ শেষ হলে ইউরোপে শুরু হয় অন্ধকারের ভয়াল কাল- এজ অব ডার্কনেস! এ প্লেগ যে অভাব ও দারিদ্র বয়ে আনে, তা থেকে ইউরোপের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে মুক্তি পেতে যুগ যুগ ধরে লড়ে যেতে হয়েছে।

তারপর প্লেগ কিছু দিন পর পরই হানা দিতো ইউরোপে। চীন থেকে সেটা ইউরোপে হানা দেয় ১৩৩৪ সালে। দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন নামে বিখ্যাত সেই প্লেগ ইতালিকে মরণের উপত্যকা বানিয়ে দেয়। এমনকি ফ্লোরেন্স শহরে ছয় মাসেই মারা যায় নব্বই হাজার মানুষ। লন্ডন শহরে লাশ গণনার সুযোগ ছিলো না। জনপদের পর জনপদ হয় উজাড়। দুর্ভিক্ষ লাভ করে ভয়াল আকার।

প্রায় আড়াই কোটি মানুষ মারা যায় ইউরোপে। কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ মহামারি অপেক্ষমাণ ছিলো সামনেই। সেটা এলো ১৩৪৬ সালে।দ্য ব্লাক ডেথ! ব্লাক সি বা কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী এলাকা থেকে ছড়ায় এ মহামারি। খাদ্যদ্রব্যবাহী জাহাজের ইঁদুরগুলো বহন করে প্লেগের ভাইরাস। ভাইরাসটির নাম ছিলো অনেকের মতে ইবোলা। কী প্রলয় লুকিয়ে ছিলো এ ভাইরাসে, সেটা বুঝেছিলো ইউরোপ। মহাদেশটির প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মানুষ নিহত হয় প্লেগে। ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সালে মানুষ কেবলই লাশ দেখেছে,দাফনের ফুরসৎ ছিলো না কারোরই। ২০০ বছর ধরে জারি থেকেছে এর প্রভাব। যাতে নিহত হয়েছে প্রায় দশ কোটি মানুষ। ব্লাক ডেথের ভেতর লুকিয়ে ছিলো অনেকগুলো দুর্ভিক্ষ ও মন্দা।

এর দাপটে যখন চারদিক তটস্থ, তখনই স্মলপক্স হানা দেয় মেক্সিকোতে। ১৫১৯ এ সেটা মহামারির রূপ নেয়,জারি থাকে দুই বছর। নিহত হয় প্রায় আশি লাখ মানুষ ইউরোপের ফরাসি, ব্রিটিশ ও ডাচরা স্মলপক্সকে বহন করে নিয়ে যায় আমেরিকায়। ছড়িয়ে পড়ে ম্যাসাচুসেটসে। ধীরে ধীরে অন্যত্র। মারা যায় প্রায় দুই কোটি মানুষ! এই যে মৃত্যুধারা, সেটা থামেনি ইতিহাসের কোনো পর্বেই। মাত্রা হয়তো কমেছে। কিন্তু মহামারির সাথে দুর্ভিক্ষের সহাবস্থান বরাবরই জারি থেকেছে।

ইউরোপ-আমেরিকায় নোবেল করোনা ভাইরাসের প্রলয়তাণ্ডব পুরনো সেই ইতিহাসকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাস শুধু ইউরোপ বা আমেরিকাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে না, সারা বিশ্বকে অচল ও গতিহীন করে দিয়েছে। উৎপাদন নেই, চারদিকে মরণের অভিশাপ। এমনকি এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা একই সাথে আক্রান্ত। যার পূর্বনজির বিশ্বের ইতিহাসে নেই।

আগেকার মহামারি ও দুর্ভিক্ষগুলো বৈশ্বিক ছিলো না, ছিলো আঞ্চলিক। কিন্তু এবারকার মহামারি সারা দুনিয়াকে অচল করে দিয়ে আসন্ন যে মহাদুর্ভিক্ষ ও মন্দার ভেরি বাজাচ্ছে, সেটা সারা পৃথিবীকেই ভাবিয়ে তুলছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু যেন মাথার উপরে ঘুরছে! কিন্তু বর্তমান করোনাকালে বিশ্বময় যে অভাব ধেয়ে আসছে, তার বিপরীতে দেশে দেশে এবং গোটা বিশ্বে নতুন অর্থনৈতিক নীতি ও কর্মসূচী অবলম্বনের বিকল্প কোথায়? শুধু রাষ্ট্রীয় কর্মসূচীতেই আসন্ন মন্দার মোকাবেলা সম্ভব নয়। এ জন্য সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিক উদ্যোগগুলোও অপরিহার্য।

প্রথমত বিলাসী ও অপচয়ী জীবনধারাকে পরিহার করতেই হবে। ভোগবাদের কোনো জায়গা থাকতে পারে না জীবনে ও সমাজে। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে এবং সবাইকে বাঁচতে হবে সবার জন্য। যে সব উপকরণ ও চাহিদাপূরণ ছাড়া জীবন অচল, সেগুলোতেই যথাসাধ্য সন্তুষ্ট হওয়া শিখতে হবে। যুবশক্তিকে এই কর্মহীনতার মধ্যে ফেলে রাখা হবে আত্মঘাতী।

তাদের জন্য আপৎকালীন বিকল্প ও উচিত কর্মসংস্থান খোঁজে নিতে হবে। তা যেমন রাষ্ট্র ও সমাজকে করতে হবে, তেমনি ব্যক্তি ও পরিবারকে উদ্যোগী হতে হবে। ঘরে অবস্থান করে উৎপাদনে নারী ও পুরুষকে এখন আপন সৃজনশীলতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। কিন্তু নিজেদের এই কঠোর সংগ্রামে ভুলে যাওয়া যাবে না সমাজের অক্ষম ও অধিক বিপন্ন অংশটিকে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ব্যাংকিং ও হোল্ডিং কোম্পানি জেপি মর্গা বলেছে, পরপর আগামী দুই প্রান্তিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দেবে করোনাভাইরাসের প্রভাবে। এছাড়া চলতি বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০১৯ সালের চেয়ে অর্ধেক কমে যাবে, জানিয়েছে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে চীনের মধ্যবর্তী পণ্য রফতানি দুই শতাংশ কমলে যে ৩৫টি দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাংলাদেশ তার একটি। এদিকে ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইন কাউন্সিলের (আইজিসি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, দুই হাজার বিশ-একুশ মৌসুমে খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক ব্যবহার বেড়ে ২২৩ কোটি টন ছাড়িয়ে যেতে পারে।

চলতি মৌসুমে যার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২১৯ কোটি টন। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে আগামী মৌসুমে খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক ব্যবহার বাড়তে পারে চার কোটি টন। সংস্থাটি জানিয়েছে, করোনা মহামারীর প্রকোপে কয়েকটি খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক চাহিদায় স্বল্পমেয়াদে তীব্র উত্থান দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে চাল ও গমজাতীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে।

করোনা ভাইরাসের শেষ কোথায় এবং মানুষ কবে নাগাদ তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে পারবে এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর এ মুহূর্তে কারো জানা নেই। কেউ বলছেন, আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা কমে এলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি শেষ হতে অনেক সময় নেবে। আবার কেউ বলছেন, এ সময় সম্ভবত কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে। বিশ্বের এই সঙ্কট নিরসনে প্রতিটি দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ভীষণভাবে জরুরি হয়ে পড়েছে।

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

May 2026
F S S M T W T
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031