ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হবে দেড় মাস পর
দেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি হিসাবে চলতি অক্টোবরে দৈনিক গড়ে আড়াই হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময় দিনে ১২ জনের বেশি রোগী মারা গেছেন।
তবে জনস্বাস্থ্যবিদদের দাবি সরকারি তথ্যের বাইরেও আরও অনেক ডেঙ্গু রোগী বাসাবাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন।
রোগতত্ত্ববিদরা বলছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতির সহসা উন্নতি হচ্ছে না। আক্রান্ত ও মৃত্যু এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
চলমান বৃষ্টিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়বে। তখন ডেঙ্গু রোগীও বাড়বে। রোগী বেশি হলে মৃত্যু আরও বাড়বে। বৃষ্টির মৌসুম শেষ হওয়ার এক থেকে দেড় মাস পর ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়াল ১ হাজার ৬৪ জনে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮০০ জন। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্তদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫০৪ জন আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২৯৬ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ৮ হাজার ৯২১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ২ হাজার ৭৫১ জন এবং অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬ হাজার ১৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ১৮ হাজার ৬৬৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে কোনো বছরে এত মৃত্যু এর আগে দেশে কখনো হয়নি। একইভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যাও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
গত তিন মাসের (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিমাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের মাসের চেয়ে বেশি। আর চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ছয় দিনের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। এ বছরের জুলাই মাস থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এবং হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু সংখ্যা বাড়তে থাকে।
আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেছে। দৈনিক গড়ে ২ হাজার ৬৫৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং গড়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়।
গত জুলাই মাসে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৪১৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। আর প্রতিদিন মারা গেছেন গড়ে ৭ জন। এরপর আগস্ট মাসে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। দৈনিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায়। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৩২২ জন করে রোগী ভর্তি হন এবং মারা যান ১১ জন।
আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেছে। দৈনিক গড়ে ২ হাজার ৬৫৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং গড়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়।
চলতি বছরের চেয়ে গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কম ছিল। গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে রোগতত্ত্ববিদরা বলছেন, চলতি অক্টোবর মাসে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। কারণ গত বছর সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল অক্টোবর মাসে।
আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৯৩২ জন। দৈনিক গড়ে ৭০৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। আর এই অক্টোবর মাসের প্রথম পাঁচ দিনে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ৪৫৮ জন। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ২ হাজার ৬৯২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এই গড় গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে বেশি এবং এ বছরের যে কোনো মাসের গড়ের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে এই ছয় দিনে ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। দৈনিক গড়ে মৃত্যু ১২ জনের বেশি। এই গড় মৃত্যু চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের সমান এবং অন্য যে কোনো মাসের চেয়ে বেশি।
এর আগে ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে ২৮১ জন মারা যান। ওই বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ডেঙ্গুতে ২৭ জনের মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে আলোচ্য বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৬২ হাজার ৩৮২ জন। ২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে ডেঙ্গু সংক্রমণ তেমন একটা দেখা না গেলেও ২০২১ সালে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। একই বছর দেশব্যাপী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, এখন বর্ষা মৌসুমের বাইরেও বৃষ্টি হচ্ছে। যত্রতত্র পানি জমছে। মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। এতে মশার বংশ বিস্তার হবে। ডেঙ্গু রোগী বাড়বে। বৃষ্টির মৌসুম শেষ হওয়ার এক থেকে দেড় মাস পর ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
