“চিঠি ছেড়ে স্কাইপ ও মেসেঞ্জারে নববধু আলেয়া “

ঝালকাঠি জেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নে প্রায় ২১ হাজার লোকের বসবাস তখন। এরই মধ্যে অনেকই জীবিকার প্রয়োজনে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছে।

সেই সময়টা বেশি দিন আগের নয় যে তারা চিঠির মাধ্যমে ভাব প্রকাশ করে তথ্যের আদান প্রদান করতো।

আমার বাবাও বিদেশে ছিলেন। মা কেও দেখতাম বাবার চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে। যেদিন ডাকপিয়ন উঠানে এসে বাইসাইকেলে ক্রিং ক্রিং বেল বাজাতো, সেদিনটা ছিল ঈদের চাঁদ দেখার মতো আনন্দ ছিল বাসার লোকজনের কাছে।

সে যে কেমন অনুভূতি, তা ভাষায় লিখে বোঝানো যাবে না। পিয়নের আগমন মানেই সবাই খুশি মনে চিঠি নিত। চিঠিসহ টিএনটি লাইন ফোনের খুব কদর ছিল তখন । বিদেশ থেকে চিঠি আসতে তখন প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগত।

নববধূ স্বামীর চিঠির জন্য অপেক্ষা করত। চিঠি আসলে লুকিয়ে লুকিয়ে এক চিঠি যে কতবার পড়তো তার ইয়াত্তা নেই। চিঠিটি পড়ে তার বালিশের নিচে রেখে ঘুমাত। ঘুম থেকে জেগে আবার পড়তো, হয়ত একবার পড়ে তার মন ভরতো না। একই অনুভূতি অপরদিকেও।

এসবের মধ্যে ছিল এক অন্যরকম আনন্দ। তখন পোষ্ট মাস্টারের ছিল বেশ কদর। মানি অর্ডার নিয়ে আসলেই তার জন্য থাকত বকশিস সাথে চা নাস্তা ফ্রি।

এভাবেই চলছিল মানুষের জীবন। দিন বদলের সনদে আধুনিক ছোঁয়া লাগতে শুরু হল দেশে। জননেত্রী শেখ হাসিনার রুপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার ঘোষনায় সারা দেশে যাত্রা শুরু করলো ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার।

প্রতিটি সেন্টারে ১ জন নারী ও ১ জন পুরুষ দুইজন উদ্যোক্তা মিলে তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় সেবায় আত্মনিয়োগ করলো।

যাদেরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আখ্যা দিলেন তাঁর ডিজিটাল সন্তান বলে। সেবা আর ব্যবসার মেলবন্ধন হল এই সেন্টার। এখানে সরকারি বেসরকারি নানা সেবার ভান্ডার দ্বার উন্মোচিত হল।

সেই সেবা ভান্ডারের জনপ্রিয় একটি সেবা হল ঘরের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের সাথেসরাসরিমোবাইল

কম্পিউটারও ইন্টারন্টে সংযোগের মাধ্যেমে একে অন্যের সাথে সরাসরি দেখে কথা বলা।তাদেরই একজন আলেয়া বেগম।

পোনাবালিয়ার ৫ নং ওয়ার্ডের দেউরী গ্রামের আলেয়ার ক্লাস সিক্সে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়েছিল একই গ্রামের লতিফ শেখের সাথে। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বিয়ের পিড়িতে বসতে হয়েছিল তাকে।

বাবার একার আয়ে চলা অনেক ভাই বোনের সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে পড়ালেখা করার ইচ্ছা থাকলেও অভাবের কারণে তা আর করা হল না।

সে সময় তাই অভিভাবকদের সবার এক কথা,‌লতিফের মত পোলারে হাত ছাড়া করন যাইবে না। কারণ লতিফ অনেক ভাল পোলা, সোনার দেশে থাকে, এমন ভালা পোলা তপস্যায়ও পাওয়া দুস্কর।

সবাই মিলে আলেয়া লতিফের দু হাত এক করে দিয়েছিল। লতিফ তখন ছুটিতে দেশে। সুখের সংসার গুছিয়ে নেবার আগেই ছুটি শেষ, লতিফকে ফিরতে হয়েছিল প্রবাসে। তারপর শুরু হল, আলেয়া অপেক্ষা কখন আসবে চিঠি..?

চিঠির অপেক্ষা শেষে শুরু হল মোবাইল ফোনের ব্যবহার। কিন্ত তখন সিমসহ মোবাইলের অনেক দাম ছিল । তাই তাদের মোবাইল কেনা হয়নি।

একদিন ইউডিসি থেকে বাড়ী যাবার পথে দেখা হলো আলেয়া ভাবী ও তার দেবর মনিরের সাথে। মনিরকে আমি চিনতাম আর তার ভাবির সম্পর্কেও জানতাম কম বেশি। মনির প্রায়ই আসতো ইউডিসিতে।

যেতে যেতে অনেক আলাপ তখন ভাবিকে ইউডিসিতে আসার দাওয়াত দিলাম, স্কাইপের কথা বলার জন্য। অল্প খরচে ডিজিটাল সেন্টার থেকে কথা বলতে পারবেন ভাবি।মোবাইল নেই বলে চিন্তা করবেন না। আমরা আছিতো আপনাদের পাশে সেবা দেওয়ার জন্য।

এই বলে আমি বিদায় নিতে যাব ঠিক তখন ভাবী কিছুটা অবাক হল। তিনি আমাকে বললেন, আজিব কথা কইও না তুমি। এইডা ক্যাম্মে হয়? তোমার লগে একদিন যামু সেন্টারে। আর তোমার ভাইরেও জিগামু এমন কইরা কথা কওন যায় কিনা? এভাবে নানান কথা ভাবির সাথে গল্প করে বিদায় নিলাম।

একদিন দেবর ভাবি সেন্টারে এসে হাজির হল। সেদিন বুধবার প্রচন্ড কাজের চাপে ব্যস্ত ছিলাম বলে বসতে বললাম। পরে ফ্রি হয়ে কথা বলে পরের শুক্রবার আসতে বললাম।

ই-মেইল আইডি দিলাম তার স্বামীকে এসএমএস করে। পরে তিনিও একটা দোকান থেকে কলব্যাক করল।শুরু হলো দুজনের কথপোকথন। কথার চেয়ে কান্নাই বেশি।চোখের জলের ভাষা আর প্রিয়জনের সান্নিধ্য কতটা মধুর সেদিন দেখলাম।

সে কথামালা যেন শেষ হতে চায় না। ইউডিসি তখন সহস্র রাত পেরোনো আরব্য উপন্যাসের মত। এভাবেই কথা হতে লাগল দীর্ঘ ৩ বছর।

তৃনমূলে জনপ্রিয় সেবাটির নাম স্কাইপ। এই ব্যবস্থা চালু হবার পর থেকেই এর ব্যবহার বাড়ল। এভাবেই পোনাবালিয়ার প্রবাসী পরিবারের ভিড় বাড়তে থাকলো ডিজিটাল সেন্টারে।

বছর খানেক আগে আলেয়া বেগমের হাতে এসেছে স্মার্ট ফোন।তার মতো অন্যদের হাতেও স্মার্ট ফোন। স্কাইপের যুগ শেষ মনে হলেও ইউডিসিতে আসা বন্ধ হয় না তাদের। ফেইসবুক,মেসেঞ্জার, ইমু ইনস্টল, ও ইন্টারনেট সংযোগ শেখার জন্য। ভালোই লাগতো তাদেরকে শেখাতে। শেখানোর পাশাপাশি টাকাও আয় হয়। তবে বেশি ভালো লাগে গ্রামের মেয়ে হয়ে গ্রামের মানুষের সুখ দু:খের ভাগীদার হতে পেরে।

সাধারণ মানুষ আমারর কাজের প্রসংশা করতেন,শুনেছি। অপার কৃতজ্ঞতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশপ্রেমী ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমানের মানসকন্যা দেশরত্ন ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারকে।
তাঁর হাত ধরেই ডিজিটালের পথে হাঁটতে শেখা,সে পথ ধরেই উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন দেখা। তাঁর দর্শনই আমাদের সফলতার মূলমন্ত্র।

 

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

August 2022
FSSMTWT
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031