দ্বীপ জেলা ভোলা ধান, সুপারি, ইলিশের জেলা হিসেবে খ্যাতি দেশজুড়ে

হিমালয় থেকে নেমে আসা তিনটি প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র বাহিত পলি দিয়ে মোহনার বুকে জেগে উঠেছে দ্বীপ জেলা ভোলা। ধান, সুপারি, ইলিশের জেলা হিসেবে ভোলার খ্যাতি দেশজুড়ে।

এ জেলার উৎপত্তির ইতিহাস যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও রয়েছে বৈচিত্রের ছোঁয়া। বিশেষ করে এখানকার চরাঞ্চলের অতিথি পাখির উড়ে বেড়ানো, হরিণের ছোটাছুটি, নদীর বুকে সারি সারি জেলের নৌকা, দল বেঁধে বুনো মহিষের বিচরণ, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, আকাশ ছোঁয়া কেওড়া বাগান আর দিগন্ত বিস্তৃত কত- সব কিছু মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। আর তাই এ জেলার নতুন নামকরণ ‘কুইন আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ’। যার বাংলা অর্থ ‘বাংলাদেশের দ্বীপের রাণী’।  নতুন এ নামকরণের ফলে ভোলা বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আরো পরিচিতি লাভ করবে। একই সাথে সারা বিশ্বে ভোলা পরিচিত হয়ে উঠবে অপার সৌন্দর্যময় দ্বীপ হিসেবে। তবে কুইন আইল্যান্ড নামকরণের পেছনে যথার্থতা রয়েছে। চারদিকে নদী বেষ্টিত থাকলেও ভোলার রূপ বিমোহিত করবে ভ্রমনকারীদের। ভোলায় আছে দর্শণীয় অনেক স্থান। এসব স্থান কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন দ্বীপের চেয়েও কোন অংশে কম নয়। সুন্দরবনের মতোই আরেক সুন্দরবন আছে ভোলার দক্ষিণাঞ্চলে।

ভোলা বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রাচীন গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ। এখানকার সংস্কৃতিতে রয়েছে মিশ্র প্রভাব। ভোলার মেঘনা তেঁতুলিয়ার তীর ঘেঁষে রয়েছে ছোট ছোট জেলে পল্লী। মাছ ধরা মৌসুমকে সামনে রেখে পল্লীর মহিলা ও শিশু কিশোররা পালাগান গেয়ে রং বেরংয়ের সুতা দিয়ে জাল বোনে। এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এসব জাল টানানো হয়। তখন বাড়িতে বাড়িতে চলে উৎসব। শষ্যের অফুরন্ত ভান্ডার এই ভোলায় কৃষকেরা মাঠে ফসল ফলায়। ধান, আলু, তরমুজ, শষা, কুমড়াসহ রবীশষ্য উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ভোলার দক্ষিণের এলাকাগুলো। সারি সারি ট্রাক বোঝাই করে এসব ফসল ভোলা থেকে যায় রাজধানীর বুকে

ভোলায় আছে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র। যা দিয়ে ৩৪.৫ মেগাওয়াট ও ২২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৪টি বিদ্যুৎ প্লান্ট করা হয়েছে। এখানে আছে কোল্ড স্টোর। উৎপাদিত গ্যাস দিয়ে শিল্প কারখানা গড়ার প্রস্তুতি চলছে ভোলায়। এ দেশকে রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করা ৭ বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের বাড়ি এই ভোলায়। জাতীয় মঙ্গলের কবি মোজাম্মেল হকও জন্মেছেন এই দ্বীপ জেলায়। ২ বারের এভারেষ্ট বিজয়ী এম.এ মুহিতের বাড়িও ভোলায়। এসব দিক দিয়ে ভোলার যেমন সুনাম আছে সারা দেশে তেমনি ভোলার সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য ভোলা যায় না কখনো।

চরফ্যাশনে দ্বিতীয় সুন্দরবন চর কুকরিমুকরি:-

চর কুকরি-মুকরি বঙ্গপোসাগরের তীর ঘেঁষে জেগে ওঠা একটি চর। চিরসবুজ গাছ-গাছালিতে ঘেরা, আর অসংখ্য নাম না জানা পাখ-পাখালি, সাথে কিছু বন্য জীব-জন্তুর অবাধ বিচরণভূমি এই চর কুকরি-মুকরিতে। যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। দৃষ্টিকে সম্মোহন করে হাতছানি দিতে থাকে টুকরো টুকরো নিবিড় বনভূমি। একদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, বৈরী বাতাস, জলোচ্ছসের গর্জন আর অন্যদিকে দেশের মূলভূখন্ডের সাথে জেগে ওঠা সবুজ দ্বীপ আর প্রাকৃতিক  সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। ওটাই চর কুকরি মুকরি। এখানকার মহিষের দুধের মিষ্টি এবং আখ ভ্রমণপিপাসুদের মনে দাগ কেটে থাকবে।

ব্রিটিশ আমলে জার্মানির যুবরাজ প্রিন্স ব্রাউন জনমানবহীন এ দ্বীপে জাহাজ নিয়ে বেড়াতে আসেন। তার আসার উদ্দেশ্য ছিল শিকার করা। কিন্তু এখানে তিনি শিকার করতে এসে দেখতে পান কেবল কয়েকটি কুকুর ও বিড়াল ছোটাছুটি করছে। নির্জন এ দ্বীপটিকে তাই তিনি কুকরি মুকরি নামে ডাকতে থাকেন। তা থেকেই এ দ্বীপের নাম হয়ে যায় চর কুকরি মুকরি।

এরপর কয়েক বছর পর্তুগিজ ও ওলন্দাজরা ঘাঁটি গড়ে তোলে এবং দস্যুপনায় মেতে ওঠে এই চরটিকে নিয়ে। এর চারদিকে সাগরের নীল জল। উত্তাল ঢেউয়ের আছড়ে পড়া দেখলেই মনে হবে কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পাশে আছেন আপনি। স্থানীয় মানুষ এ স্পটটিকে বালুর ধুম নামেও ডেকে থাকে।

তবে কুকরি মুকরির প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে সাগরপাড়। এখানে দাঁড়িয়ে আপনি সূর্যাস্ত কিংবা সূর্য ডোবার দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। চর কুকরি মুকরির এই বিশেষ সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকরা ভিড় করে থাকেন। নৌকা নিয়ে সারা দিন ভ্রমণ করা যায় এই স্থানটিতে। সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় নয়নাভিরাম নৈসর্গিক সৌন্দর্য। দেখা যায় উপকূলের সাহসী মানুষদের প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার এক সংগ্রামী প্রেরণা ও প্রেয়সীর স্বপ্নের ঘর বাধার অপরূপ বাসনা। তাই এখানে পর্যটনশিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে এই স্থানটিকে নিয়ে।

চরফ্যাশনের দক্ষিণ উপকূলে দক্ষিণ আইচা থানার অন্তর্গত চর কুকরি মুকরি ইউনিয়নে ম্যানগ্রোভ বাগানের কয়েক হাজার হেক্টর এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে মানব সৃষ্ট সুন্দরবন। কেবল মাত্র প্রাকৃতিকভাবে নয় প্রকৃতি এবং মানুষের যৌথ উদ্দেগে বিকশিত হচ্ছে এ সুন্দরবনটি।

আগামী ১৫-১৬ বছর পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুন্দরবন হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ নিয়ে কাজ করছে কুকরি-মুকরি বন বিভাগ। সরকারী অর্থায়নে কুকরি বন গভেষনা বিভাগ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ১৯৭২ সনে চরফ্যাশনের দক্ষিণ উপকূলে কুকরি-মুকরিতে ম্যানগ্রোভ বাগান তৈরী করে বন বিভাগ। বর্তমানে কুকরিতে ৩ হাজার হেক্টর সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বাগান রয়েছে এবং আরো ৪ হাজার ৬ হেক্টর বাগান সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢালচরেও ৬ হাজার হেক্টর বনায়ন করা হয়েছে।

এসব বাগানের বেশিরভাগই কেওড়া প্রজাতির গাছ রয়েছে। যা ২০ থেকে ২৫ বছর বয়স প্রাপ্তির পর পর্যায়ক্রমে মরতে শুরু করছে। কুকরি এবং ঢালচর রেঞ্জের আওতায় ১৫ টি বাগান রয়েছে। যেগুলো অপেক্ষাকৃত পুরাতন এবং টেকসই হয়েছে। এসব বাগানের উচ্চতা বেড়েছে। ফলে এখানে কেওড়া প্রজাতির ম্যানগ্রোভ বাগানের নিচে সুন্দরবনের বৃক্ষপ্রজাতিগুলোতে সৃষ্টি শুরু করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপকূলের ম্যানগ্রোভ বাগানের কেওড়া প্রজাতির বৃক্ষ মরে যাবে। যার শূণ্যস্থান দখল করবে সুন্দরবন প্রজাতির গাছ-সুন্দরী, পশুর, গেওয়া, খলসী, ধুন্দল, বাইন, কেরপা, হেন্তাল, গড়ান, গোলপাতা, কাঁকড়া এবং বাইন।

কুকরির চর দিগল, নার্সারির খাল, চর শফি, চর জমির এবং জাইল্যার খালের ১৬ একর বাগানে সুন্দর প্রজাতির বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে এবং যাদের শতকরা ৮০ ভাগ বৃক্ষই টিকে গেছে যা প্রত্যাশা চেয়ে বেশি। কুকরি বন গবেষণা কর্মকর্তা জানান, ১৯৯০ সনে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে এখানে সুন্দরবন প্রজাতির বৃক্ষের চারা উৎপাদন এবং বনায়ন শুরু করা হয়। প্রথম প্রথম সুন্দরবন থেকে বীজ সংগ্রহ করে কুকরিতে সিডবেডে চারা উৎপাদন এবং বনায়ন করা হয়েছে। এখন কুকরির বাগানের গাছ থেকেই বীজ সংগ্রহ চারা উৎপাদন এবং বনায়ন করা হয়।

আন্ডার প্লান্টিং ট্রায়েল উইথ ম্যানগ্রোভ স্পেসিস ইন দ্যা কোস্টাল বেল্ট অব বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বন গবেষণা ইউনিট মানব সৃষ্টি সুন্দরবন গড়ার কার্যক্রম এগুচ্ছে। ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন সময় রোপিত সুন্দরী, গরান, গেওয়াসহ সুন্দরবন প্রজাতির গাছগুলো ৩০/৪০ ফিট পর্যন্ত উঁচু হয়েছে। এসব গাছ থেকে বীজ ঝড়ে প্রাকৃতিকভাবেই বাগানগুলোতে নানান আকৃতির সুন্দর বন প্রজাতির গাছ ছেয়ে গেছে। সুন্দরবন প্রজাতির বৃক্ষের বিকাশের চলমান ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে আগামী ১৫ বছর পর কুকরি হবে মানবসৃষ্ট সুন্দরবন আর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুন্দরবন।

এ বনে চিত্রা হরিণ, বানর, উদবিড়াল, শিয়াল, বন্য মহিষ-গরু, বন-বিড়াল, বন মোরগ প্রভৃতি বন্য প্রাণী। আর পাখি ও সরিসৃপ হিসেবে এই বনের অধিবাসীদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বক, বন মোরগ, শঙ্খচিল, মথুরা, কাঠময়ূর, কোয়েল, গুইসাঁপ, বেজি, কচ্ছপ ও নানা ধরনের সাপ ইত্যাদি প্রাণী রয়েছে।

তারুয়া সৈকতঃ সৌন্দর্যের লীলাভূমি:-

প্রথমে যখন দূর থেকে দিগন্ত রেখায় কালো রেখার মত তারুয়া দ্বীপের গাছগুলো দৃষ্টি সীমানায় আসে তখনও পেছনে ঢালচর বা কালীরচর দৃষ্টি সীমানা হতে হারিয়ে যাবে না। তন্ময় হয়ে ভ্রমণ পাগল মানুষ চেয়ে থাকে সেই হাতছানি দেয়া অপার সৌন্দর্যের সমুদ্রতটের পাণে। ঢাল চর থেকে প্রায় ঘণ্টাখানেকের মত সময় ইঞ্জিন নৌকায় সমুদ্রপথ মাড়িয়ে চরফ্যাশন এর আলোচিত সম্ভাবনাময় পর্যটন সৈকত তারুয়ায় যাওয়া যায়।

কুকরি মুকরি, ঢালচর ঘুরে ইচ্ছে হবে তারুয়া দ্বীপের চমৎকার বালুকাবেলায় কিছু সময়ের জন্য আনন্দ অবগাহনের। নিশ্চুপ, কোলাহল মুক্ত, ফাঁকা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা সৈকতের দিকে চেয়ে থাকলে হৃদয়ের গোপনে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি পাওয়া যায়। দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত নীরবে একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছে যেন আপনাকে বরণ করে নিতে। শোনা গেছে এখানে হোটেল মোটেল করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে পর্যটনের বিকাশের লক্ষ্যে! এমনকি শুটিং স্পট এর জন্য খ্যাত সম্পন্ন জায়গা তারুয়া দ্বীপ। কিছুদিন আগে ঐ তারুয়া দ্বীপে ঢাকার চলচ্ছিত্র শিল্পিরা “অনেক সাধের ময়না” ছবিটি শুটিং করে গেছেন।

প্রায় চল্লিশ বছর আগে জেগে ওঠার পর থেকে এই দ্বীপ মাছ ধরার জেলেদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। লোকমুখে শোনা যায়, সেখানে এক প্রকার সামুদ্রিক মাছ প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ত যেগুলোর আঞ্চলিক নাম ছিল তারুয়া। সেই থেকে নাকি এই দ্বীপের নাম হয়েছে তারুয়া দ্বীপ।

চরফ্যাশন থেকে কচ্ছপিয়া ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার জন্য বাস, টেম্পু ও বিভিন্ন সড়ক যান রয়েছে। কচ্ছপিয়া ঘাট পৌঁছে সেখান থেকে ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করে সহজে যাওয়া যায় কুকরি মুকরি অথবা ঢালচর হয়ে তারুয়া দ্বীপ। চাইলে সরাসরিই যাওয়া যায় তারুয়া দ্বীপ। তবে যে হারে পর্যটকের সংখ্যা এবং নানান পর্যটন বিকাশের কার্যক্রম চলছে, খুব শীঘ্রই হয়ত সেই নীরব কোলাহল মুক্ত তারুয়া দ্বীপ ঠাই পাবে ইতিহাসের পাতায়, পরিণত হবে আরেক সেন্টমার্টিন!

এশিয়ার সর্বোচ্চ আলোকসজ্জিত জ্যাকব টাওয়ার:-

চরফ্যাশনে উপমহাদেশের সর্বোচ্চ আলোকসজ্জিত ওয়াচ টাওয়ার নির্মান করা হয়েছে। টাওয়ারটির উচ্চতা প্রায় ১৭০ ফুট। টাওয়ারটিতে লিফটের সংযোজন করা হয়েছে। থাকছে উচ্চ ক্ষমতার বাইনোকুলার, যাতে ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার নানা কিছু দেখা যাবে অনায়াসে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭ তলাবিশিষ্ট ঐ দৃষ্টিনন্দন টাওয়ারটি পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করছে। ইতোমধ্যে চর কুকরি মুকরি, ঢালচরসহ আশপাশের বনাঞ্চলে ইকোপার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।

আলোক সজ্জিত ওয়াচ টাওয়ারের নাম ‘জ্যাকব টাওয়ার’। এ টাওয়ারে দাঁড়ালেই পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদীর জলধারা, পূর্বে মেঘনা নদীর উথাল-পাতাল ঢেউ, দক্ষিণে পর্যটন এলাকা, চর কুকরি মুকরিসহ বঙ্গোপসাগরের বিরাট অংশ নজরে আসছে।

চরফ্যাশনের দক্ষিণে সাগর মোহনার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ কুকরি মুকরি, ঢালচর, তারুয়া দ্বীপ সৈকত প্রকৃতির এক অপার সৃষ্টি। কয়েক বছরে ওই স্পটগুলো ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছেন ওইসব এলাকায়।

প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা অপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চরফ্যাশনে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন এই টাওয়ারটি। ইতোমধ্যে টাওয়ারটি দেখার জন্য প্রতিদিন শত শত মানুষ বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে যাচ্ছেন টাওয়ারটির কাছে।

সাগর কন্যা মনপুরা:-

ভোলা সদর থেকে ১৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে মেঘনার বুকে জেগে ওঠা দ্বীপ মনপুরার অবস্থান। প্রমত্তা মেঘনার উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে আসা পলি জমে এ দ্বীপের সৃষ্টি। সাগরের কোলে জন্ম নেওয়ায় স্থানীয়দের কাছে মনপুরা ‘সাগর কন্যা’ হিসেবে পরিচিত।

এখানে ভোরে সূর্যের আগমনী বার্তা আর বিকেলে পশ্চিম আকাশে একটু একটু করে মেঘের আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য অতুলনীয়। আবার রাতে দ্বীপের অন্য রূপ। ঘোমটা জড়ানো বধূর মতো নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায় পুরো দ্বীপ। প্রায় আটশ বছরের পুরনো মনপুরা উপজেলা বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চল তথা দেশজুড়ে পরিচিত একটি নাম।

মনপুরার ইতিহাস প্রাচীন। সাতশ বছর আগে এখানে পর্তুগীজ জলদস্যুদের আস্তানা ছিল। যার প্রমাণ মেলে সেখানকার বড় লোমযুক্ত কুকুর দেখে। এখানকার পর্যটন সম্ভাবনা প্রচুর। পর্যটকদের কাছে মনপুরার আর্কষণীয় বিষয় হচ্ছে, এখানকার হাজার হাজার একর জায়গাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এ ছাড়াও রয়েছে বাহারী প্রজাতির বৃক্ষ, তরুলতা। আরো রয়েছে হরিণ, বানর, ভালুকসহ বিভিন্ন প্রাণী। গহীন জঙ্গলে ভয়ংকর কিছু প্রাণী রয়েছে বলেও জনশ্রূতি রয়েছে।

মনপুরায় রয়েছে ৮ থেকে ১০টি বিচ্ছিন্ন চর। এগুলো চর তোজাম্মেল, চর পাতিলা, চর জামশেদ, চর পিয়াল, চর নিজাম, লালচর, বালুয়ার চর, চর গোয়ালিয়া, কলাতলির চর ও সাকুচিয়ার চর নামে পরিচিত। চরগুলো দেখলে মনে হবে কিশোরীর গলায় মুক্তার মালা। চরাঞ্চলে বন বিভাগের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সবুজের বিপ্লব। চোখ ধাঁধানো রূপ নিয়েই যেন চরগুলোর জন্ম। চরগুলোতে রয়েছে মানুষের বসতি। যাদের জীবন যাত্রা কিছুটা ভিন্ন। জেলে, চাষী, দিনমজুর, কৃষক এবং খেয়া পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করে এখানকার বেশীর ভাগ মানুষ।

স্থানীয়দের দাবি, ভ্রমণপিপাসু মানুষকে মুগ্ধ করার মতো ক্ষমতা রয়েছে সাগর কন্যার। শীত মৌসুমে এর চিত্র পাল্টে যায়। সাইবেরিয়া থেকে ছুটে আসা অতিথি পাখিদের আগমনে চরাঞ্চলে যেন নতুন প্রাণ জেগে ওঠে। তখন সাগর কন্যা মনপুরা অতিথি পাখিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। দেশের অন্যসব পর্যটন কেন্দ্রের তুলনায় মনপুরার চিত্র কিছুটা ভিন্ন।

মাইলের পর মাইল সবুজ বৃক্ষের সমাহার দেখে প্রথমে একে ঠিক চর মনে হবে না। যেন ক্যানভাসে আঁকা শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়া। মনপুরায় নানান প্রজাতির গাছের সংখ্যা রয়েছে ৫ কোটিরও বেশি। রয়েছে একটি ল্যান্ডিং স্টেশন। সেখান থেকে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

ভোলার হরিণ:-

ভোলার মেঘনা নদী ও সাগর মোহনায় অর্ধশতাধিক বিচ্ছিন্ন চরে প্রায় ৭০ হাজার একর জমিতে ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। এর মধ্যে চরফ্যাশনের চর কুকরি-মুকরি, ঢালচর, তজুমদ্দিন, চরফ্যাশন, কুকরি মুকরি, ঢালচর, পাতিলা, মনপুরার ঢালচর, বদনার চর, মনপুরার চরপিয়াল, কলাতলির চর, জাগলারচর, বদনার চর, জংলারখাল,  নিঝুম দ্বীপের মনপুরার অংশে চর পাতালিয়াসহ ২০টি সংরক্ষিত বনে প্রায় ২২ থেকে ২৪ হাজার হরিণ রয়েছে। প্রতি বছর জানুয়ারি-মার্চ মাসের দিকে বনে মিঠা পানির সংকট দেখা দেয়। তখন এসব হরিণ লোকালয়ে চলে আসে।

গত বছর লোকালয় থেকে ২২টি এবং এ বছর ১০টি হরিণ উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে। ভোলার নতুন নতুন বনে হরিণ ছাড়ার ফলে হরিণের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সংরক্ষণের উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

ইলিশ ভোলার অফুরন্ত মৎস্য সম্পদ:-

ইলিশ বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য সম্পদ। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে এ মাছের অবদান প্রায় ১২% এবং বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৩.৪০ লক্ষ মেট্রিক টন যার বাজার মূল্য প্রায় ১০,০০০ (৩০০/কেজি) কোটি টাকার ঊর্ধ্বে। জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১.০%। ইলিশ মাছের সিংহভাগ ভোলা থেকেই আহরণ করা হয়ে থাকে। এখানকার মেঘনা, তেঁতুলিয়া, ইলিশা নদীতে হাজার হাজার জেলে নৌকা, ফিসিং বোট নিয়ে মাছ ধরতে নামে। রাতের বেলায় নদীর বুকে মাছ ধরা নৌকাগুলোকে ভাসমান নক্ষত্রের মতো মনে হয়। কর্মসংস্থানেও ইলিশ মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

বঙ্গোপসাগরের এ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় সারা বছর ইলিশ ধরা পড়ে। ইলিশের জন্য বিখ্যাত ভোলায় প্রতি বছর ৯০ থেকে ৯৫ হাজার মেঃ টন ইলিশ আহরণ করা হয়। আর ১ লক্ষ ৪৫ হাজার জেলে এ পেশার উপর নির্ভরশীল। ইলিশ মৌসুমে ভোলার মৎস্যঘাটগুলো সরগরম হয়ে উঠে। ঘাট এলাকা প্রসারিত হয়ে তখন অর্ধ কিলোমিটারের মত এলাকা জুড়ে যায় মাছের আড়তে।

বাক্স, ডালা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে নদী থেকে ইলিশ নিয়ে ফেরত আসা নৌকার জন্য। তখন আড়তদার, দাদনদারা ব্যস্ত হয়ে উঠে জেলেদের নিয়ে। ইলিশকে কেন্দ্র করে বড় ধরণের দাদন ব্যবসা চালু রয়েছে ভোলায়। জেলেদের ইলিশ ধরার জন্য জাল, নৌকা সব কিছুই দাদনে দিয়ে থাকে আড়তদাররা। এখানে ব্যবসা করার জন্য চাঁদপুর, চট্টগ্রাম থেকেও ব্যবসায়ীরা আসে। তারা বড় বড় ফিসিং বোটে কোল্ড স্টোর রেখে নদী থেকেই জেলেদের কাছ থেকে ইলিশ কিনে নিয়ে যায়। কেউ কেউ মৎস্যঘাটগুলোতে দাদনদারদের সাথে চুক্তি করে। ওই সময় নদী পাড়ে জেলেদের ঘরগুলো থেকে ইলিশ ভাজার মৌ মৌ গন্ধ ভেসে আসে নাকে। নদী পাড়ে ছোট ছোট শিশুদেরও ইলিশ মাছ হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি নিয়ে যেতে দেখা যায়।

অতিথি পাখির অভয়ারণ্য ভোলা:-

শীতের শুরুতেই অতিথি পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত দ্বীপ জেলা ভোলায় অতিথি পাখি আসতে শুরু করে। অতিথি পাখির কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে উঠে দক্ষিণের সাগর উপকূল। দক্ষিণের সাগর উপকূলে প্রতি বছর লাখ লাখ অতিথি পাখি শীত মৌসুমের শুরুতে আসতে থাকে। অথচ এ সময়ে দক্ষিণের ঢালচর, কুকরি মুকরি, চর শাহজালাল, ভাষানচর, পূবের চর, চরনিজাম, শিয়ালর চর, নিঝুম দ্বীপসহ ভোলার অর্ধশতাধিক চর চরাঞ্চল লাখো অতিথি পাখির নিরাপদ নিবাস হিসেবে পরিচিতি পায়। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে এসব অতিথি পাখি খাদ্যের সন্ধানে এবং অতি শীত থেকে বাঁচার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে আসে।

পাখি বিশেষজ্ঞ ও নেচার কনজারভেশন কমিটি (এনসিসি)’র চেয়ারম্যান সাজাহান সরদার জানান, বাংলাদেশে আসা অতিথি পাখির প্রায় ৬০ ভাগ পাখি এ দ্বীপ জেলা ভোলায় আসে। ভোলার দক্ষিণের বিচ্ছিন্ন চরগুলোতে এরা খাদ্যের সন্ধানে ও নিরাপদ আবাস হিসেবে অবস্থান নেয়। এর মধ্যে ২৮ প্রকার জলচর পাখিসহ প্রায় ৫০ প্রজাতির অতিথি পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে ভোলার চরাঞ্চলে।

পাখিদের কিচির-মিচির ডাক, বিল-জলে শালুক-কচুরিপানায় বিচরণ, দল বেঁধে ওড়া, খাদ্য গ্রহণ- কার না দেখতে ভালো লাগে। যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকের কাছে এটি একটি মনোলোভা দৃশ্য। আর এই দলে যদি থাকে নানান প্রজাতির পরিযায়ী পাখি, তবে তো কথাই নেই। এতদিন শীত মৌসুমে বাইক্কা বিল, টাংগুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওরসহ গুটিকয়েক অঞ্চলে দেশি ও পরিযায়ী পাখির মেলা দেখার ব্যবস্থা ছিলো। এবার এতে যোগ হলো চরফ্যাশনের কুকরি-মুকরি।

পর্যটকদের আরও বেশি আকৃষ্ট করতে চরফ্যাশন উপজেলার কুকরি-মুকরি ইউনিয়নের চর পাতিলা এলাকায় নির্মিত হয়েছে পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র।

এখান থেকেই এখন দেখা যাবে সব পরিযায়ী পাখি। দেশি-বিদেশি পাখি দেখার জন্য বন বিভাগ প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক এ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। শীত মৌসুমে এ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে পর্যটকরা দেশি ও বিদেশি পরিযায়ী বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরণ দেখতে পাবেন। পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে কুকরি-মুকরি ইউনিয়নের চর পাতিলা এলাকায় পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়। সেখানে পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু ছাতা, বসার বেঞ্চ ও একটি ব্যারাক নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে দু’জন বন প্রহরী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটির রক্ষণাবেক্ষণ করেন।

ঐতিহ্যের চিহ্ন জমিদার বাড়ী:-

জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলেও ভোলায় অনেক জমিদার বাড়ি সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে এখনো। যেমন- মানিকা মিয়া বাড়ি, কুতুবা মিয়া বাড়ি, দেউলা তালুকদার বাড়ি, পরান তালুকদার বাড়ি, রজনী করের বাড়ি ইত্যাদি। তবে দৌলতখানের জমিদার কালা রায়ের বাড়ি ছিল বিখ্যাত। তার প্রাসাদে হতো বাইজী ও ক্লাসিকাল ঢঙের ওস্তাদদের গান। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এ বাড়ি। এছাড়া জাগ্রত মাজার হচ্ছে হযরত উজির চান করনীর মাজার।

ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার প্রত্যন্ত জনপদ দেউলা-সাচরা ইউনিয়ন। এলাকার প্রবেশ পথে পাঁকা রাস্তার পাশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টি নন্দন বেশ কিছু স্থাপনা। ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম এসব স্থাপনাগুলো তৈরী করেছিলেন তৎকালীন জমিদার বোরহানউদ্দিন চৌধুরী। বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ীর অনেক ঐতিহ্যই এখন বিলীন হয়ে গেছে।

তবে এখনও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত বসত বাড়ি এবং দৃষ্টিনন্দন মসজিদ সহ বিভিন্ন স্থাপনা। প্রায় দেড়শ বছর আগে নির্মিত এসব স্থাপনা আজো স্বমহিমায় টিকে আছে। বাড়িটির ভেতরে প্রবেশ করলেই প্রতিটি পরতে পরতে দেখতে পাওয়া যায় জমিদারী আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া। বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ির দরজায় স্থাপিত মসজিদটিও বেশ দৃষ্টিনন্দন।দিল্লী থেকে আনা শ্বেতপাথর আর বেলজিয়ামের লোহা দিয়ে নিখুঁতভাবে তৈরী এই জমিদার বাড়ির স্থাপনাগুলো এখনো দৃষ্টিকাড়ে নতুন প্রজন্মের।

বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ির দরজায় মুসাফিরদের জন্য ছিল তিনটি কাচারি ঘর। দুর-দুরান্ত থেকে আগত মুসাফিরদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল এখানে, কিন্তু এখন আর সেসব ঐতিহ্য নেই। মসজিদ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য কয়েকশ একর জমি রেখেছিলেন বোরহানউদ্দিন চৌধুরী। কিন্তু সেসব জমির অধিকাংশই বেহাত হয়ে গেছে। বর্তমানে মসজিদের নামে ৮৪ একর জমি থাকলেও তার অধিকাংশই ব্যক্তি মালিকানায় ভোগ দখল চলছে।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে চলে আসেন শাহ সুজা, তখন তার সহকর্মিরা ছড়িয়ে পড়েন দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে, তাদেরই একজন ছিলেন মোঃ হানিফ। তিনি বসতি শুরু করেন দেশের বৃহত্তম গাঙেয় দ্বীপ তৎকালীন ভোলা মহকুমায়। হানিফ হাওলাদারের পুত্র সন্তান হলেন মোঃ শরীয়ত উল্লাহ হাওলাদার, তার চার সন্তান হলেন যথাক্রমে জহির উদ্দিন হাওলাদার, সমর উদ্দিন হাওলাদার, করিম উদ্দিন হাওলাদার ও কমর উদ্দিন হাওলাদার।

এদের মধ্যে জহির উদ্দিন হওলাদারের ঘরে জন্ম নেন বোরহানউদ্দিন চৌধুরী। পারিবারিকভাবে তারা ছিলেন বিশাল সম্পদের মালিক। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় তাদের ছিল হাজার হাজার একর সম্পত্তি। বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ‘চৌধুরীর হাট’ গড়ে উঠেছে এই বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর নামেই। ভোলা শহরে প্রথম যে দুটি পাকা দালান (ভবন) তৈরী হয়েছিল, তার একটির মালিক ছিলেন বোরহানউদ্দিন চৌধুরী অন্যটি রজনী করের ভবন হিসেবে পরিচিত।

বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বসতি গড়ে তোলেন সাচরা ইউনিয়নে। তখন দেউলা-সাচরা সহ পুরো এলাকার জমিদার ছিলেন তারা, পরবর্তীকালে তার নামানুসারেই ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার নামকরন করা হয়। ২১ বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ছিল বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর ১০৩তম মৃত্যুবার্ষিকী।

ভোলার কাঁচা দুধের দধি, ছানা মিষ্টি ও মহিষ বাথান:-

ভোলায় কাঁচা দুধের দধি ছাড়া বিয়ে থেকে শুরু করে যে কোনো পারিবারিক প্রীতিভোজই যেন অপূর্ণ থেকে যায়। ব্রিটিশ আমল কিংবা তারও আগে থেকে ভোলা শহরের ঘোষ সম্প্রদায়ের বাণিজ্যিক বিনিয়োগ আর সুস্বাদু দধি তৈরির ঐতিহ্য নিয়ে সরগরম ওই ঘোষপট্টি। দিনের পর দিন ঐতিহ্যের গুরুত্ব যেন বাড়ছে।

ঘোষপট্টিতে কাঁচা দুধের দধি, গাভির দুধের দধি, আর মিষ্টি সন্দেশের দোকান রয়েছে ৫০টির মতো। কৃষিভিত্তিক এই কুটির শিল্প যুগ যুগ ধরে ভোলা ও আশপাশের জেলার মানুষের জীবনে অতুলনীয় মিষ্টান্ন আর দধির স্বাদ গ্রহণের সুযোগ দিয়ে আসছে।

শাইখ সিরাজ চ্যানেল আইতে হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানে তুলে ধরেছেন ঐতিহ্যবাহী ভোলার চরাঞ্চলের মহিষ বাথানের বিচিত্র গল্প। যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে একশ্রেণির পশু পালক মহিষ লালন-পালন করে। মহিষ বাথানের জীবন-জীবিকা, সংগ্রামের হিসাব বেশির ভাগ মানুষেরই অজানা। মহিষ বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল দেহধারী চতুষ্পদ প্রাণী। যার গায়ের রং কালো কুচকুচে। বড় দুটি শিং।

কিছুটা হিংস্রস্বভাবের এ প্রাণীর দেখা মিলবে ভোলার দখিনের যে কোন চর কিংবা দ্বীপ গাঁয়ে পা রাখলেই। খোলা সবুজ চর-দ্বীপগুলোতে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো আর নদী-সাগরের পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গা চুবিয়ে গড়াগড়িতেই মহিষের আনন্দ। একটা সময়ে দক্ষিণ উপকূলে মহিষের সংখ্যা ছিল আরও। প্রায় প্রতিটি অবস্থাপন্ন কৃষকের ছিল মহিষের বাথান। একেকটি বাথানে তিন-চার শ’ কিংবা তার চেয়েও বেশি মহিষ ছিল।

অবস্থাপন্নদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেকটা নির্ভর করত মহিষের সংখ্যার ওপর। যার যত বেশি মহিষ, তার দাপট তত বেশি। সে সময় মহিষের দুধ, ঘি, দই এতটাই সস্তা ছিল যে, তা খাওয়ার মানুষ পর্যন্ত ছিল না। একমাত্র বাথান দেখাশোনাকারী রাখালদের পেটে কিছুটা যেত। বাকিটার হতো অপচয়। তবে মূলত রাখালদের হাত ধরেই এ অঞ্চলে মহিষের দই জনপ্রিয় খাবারের তালিকায় উঠে আসে।

একেকটি মাদি মহিষ সর্বনিম্ন তিন-চার লিটার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দশ-বারো লিটার পর্যন্ত দুধ দেয়। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় বর্ষায় মহিষের দুধ হয় বেশি। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ দু’ভাবে মহিষের দই পাতে বা তৈরি করে। দুধ চুলায় জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করে যেমন দই পাতা যায়। আবার একেবারে কাঁচা দুধ দিয়েও দই পাতা হয়। তবে চুলায় জ্বাল দেয়া দইয়ের তুলনায় কাঁচা দইয়ের স্বাদ বেশি। বেশ টক টক লাগে। চব্বিশ ঘন্টাতেই দুধ জমে ঘন দই হয়। দইয়ের ওপরে জমে ওঠে ননি বা মাখনের পুরো আস্তর। ননি দিয়ে তৈরি হয় ঘি। গরুর দুধের চেয়ে মহিষের দইয়ে অনেক ননি। ফ্রিজে মহিষের দই তেমন পুষ্টি হয় না। স্বাদও অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়। দই পাতার জন্য নতুন মাটির পাতিল ব্যবহার সবচেয়ে ভাল।

বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা এবং ভোলা অঞ্চলের মানুষের কাছে আবহমান কাল থেকে মহিষের দই সমান জনপ্রিয় হয়ে আছে। ছেলে বুড়ো সবার কাছেই রয়েছে এর সমান কদর। মোটা চালের ভাপ ওঠা গরম ভাত। সঙ্গে খেজুরের গুড় আর মহিষের দই। তুলনাহীন খাবার।

এখনও চরাঞ্চলের বহু পরিবার পান্তা ভাতেও মহিষের দই খায়। চিড়া মুড়ি খেজুরের সঙ্গে মহিষের দই সকালের নাস্তা হিসেবেও উপাদেয় খাবার। তাই বরিশালের দক্ষিণ উপকূলের মানুষের খাবারের তালিকায় শীর্ষ স্থানটি আজও দখল করে আছে মহিষের দই। রূপ রস বর্ণ যে কোন দিক থেকেই হোক না কেন, এর খ্যাতি এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং বেড়েছে।

অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে নানা অনুষ্ঠানে আজকাল মহিষের দই ব্যবহার হচ্ছে। বহু অভিজাত পরিবারের খাবার টেবিলে দেখা মেলে মহিষের দই। দূর শহর থেকে নতুন বদলি হয়ে কর্মস্থলে আসা কর্মকর্তাদেরও সবার আগে চাই মহিষের দই। সবমিলিয়ে দক্ষিণের বিশেষ করে চর-দ্বীপাঞ্চলের মহিষের দইয়ের পরিচিতি এখন আঞ্চলিকতার গন্ডি ছাড়িয়ে গেছে।

দুধ থেকে দই ছাড়াও ভোলায় তৈরি হয় ছানা রসগোল্লা বা ছানা মিষ্টি। ভোলার ঐতিহ্যবাহী ছানার রসগোল্লা। এটি ভোলা ছাড়া দেশের অন্য কোন জেলায় তৈরী হয় না। তাই ভোলার ছানার রসোগোল্লার কদর রয়েছে সর্বত্র।

অনেকটা বগুরার দই, সিলেটের চা, দিনাজপুরের লিচু, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কুষ্টিয়ার তিলেরখাজার যেমনটা রয়েছে। ভোলার ঘুইংগারহাট এলাকায় এ ছানা রসগোল্লা তৈরি হয়। এ মিষ্টি যে খেয়েছে সে দেশের যেখানেই থাকুক, ভোলায় আসলে ঘুইংগারহাটের মিষ্টি না খেয়ে যায় না মিষ্টিভোজিরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভোলার এ মিষ্টি ও দধি উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হয়।

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

November 2021
FSSMTWT
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930