ব্রিটেন প্রধানমন্ত্রীর কিছু হলে সরকার চলবে কীভাবে?
করোনাভাইরাস মহামারি গত ৭৫ বছর তো বটেই, কারও কারও মতে গত এক শতাব্দীর সবচেয়ে নজিরবিহীন সংকটে ফেলেছে ব্রিটেনকে। কিন্তু এই ভয়াবহ সংকটের সময়ে জনগণের পাশে নেই দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে লন্ডনের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত সেইন্ট থমাস হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।
তবে অসুস্থ বরিস জনসনের কিছু হলে দেশ চলবে কীভাবে? এই জরুরি সংকটের সময় রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কে নেবেন? কীভাবে নেবেন? সরকারের নেতৃত্ব কে দেবেন?
ব্রিটেনে গতরাত থেকে ঘুরে ফিরে এসব প্রশ্ন উঠছে। ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির প্রথম সারির নেতা আর মন্ত্রীদের এসবের উত্তর দিতে হচ্ছে। কিন্তু এ পর্যন্ত গণমাধ্যমে যেসব সাক্ষাৎকার তারা দিয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছে সংশয় তো দূর হয়ইনি, বরং আরও ঘনীভূত হয়েছে।
তবে বরিস জনসনের কিছু হলে ব্রিটেনের সরকার চলবে কীভাবে-এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেছে বিবিসি বাংলা।
প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু ঘটলে তখন কী?
যদি প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু ঘটে বা যদি তিনি অনেক দীর্ঘ সময়ের জন্য শারীরিকভাবে দায়িত্ব পালনে একেবারে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন রানি হয়তো দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাবকে একটি সরকার গঠন করতে বলতে পারেন। অন্তত অর্ন্তবর্তীকালীন এক সরকার। যতক্ষণ না মন্ত্রীপরিষদ সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অন্য কারও নাম প্রস্তাব না করছে।
ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি একজন নতুন নেতা নির্বাচিত না করা পর্যন্ত ডমিনিক রাবই দায়িত্ব পালন করে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রিটেনের একটি থিংক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্ট’ এর মতে, প্রধানমন্ত্রী যদি মারা না যান বা পদত্যাগ না করেন, তিনিই ওই পদে আছেন বলে ধরে নিতে হবে।
ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্ট বলছে, রাজনৈতিক দল তাদের নেতা পদত্যাগ করলে বা একেবারে অক্ষম হয়ে পড়লে, তখন একজন অস্থায়ী নেতা নির্বাচন করতে পারে। কিন্তু ব্রিটেনে ‘অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী’ বলে কোনো পদ নেই।
সরকার পরিচালনায় সংকট
জরুরি সংকটের সময় সবাই যখন সরকারের দিকে তাকিয়ে, তখন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের অসুস্থতা এবং অনুপস্থিতি সরকারকে কিছুটা বিপাকে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করেন বিবিসির রাজনৈতিক সংবাদদাতা লরা কুনসবার্গ।
সরকারের একজন মন্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন, সরকার বেশ বলিষ্ঠ, দ্রুত এবং দক্ষতার সঙ্গেই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যাচ্ছে, দায়িত্বে যিনিই থাকুন না কেন।
কিন্তু লরা কুনসবার্গ বলছেন, ব্রিটেনের সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তো কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতীক নন, তিনি সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্র্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এরকম এক গুরুতর জাতীয় সংকটের সময়ে, যখন কিনা জনগণের স্বাস্থ্য আর দেশের অর্থনীতি নিয়ে এত গুরুতর সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে, তখন প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি পুরো সরকার এবং প্রশাসনযন্ত্রের জন্য একটা সংকটময় মুহূর্ত। বরিস জনসনের অসুস্থতার কারণ সরকার যেন অতটা স্থিতিশীলভাবে কাজ করতে পারছে না।
বরিসের ডেপুটি
টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে, রেডিও টকশোতে আজ উপস্থাপকরা কোনো লুকোছাপা না করে সরাসরি সরকারের মন্ত্রীদের কাছে প্রশ্ন রাখতে শুরু করেছেন- যদি প্রধানমন্ত্রীর কিছু হয়, যদি তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন কী ঘটবে? কে সরকারের দায়িত্ব নেবে?
১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের তরফ থেক জানানো হয়েছে, ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব, যিনি ‘ফার্স্ট সেক্রেটারি অব স্টেট’, তিনিই এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করবেন।
বরিস জনসনকে গত সোমবার আইসিইউতে স্থানান্তরের পরপরই টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে এসে ডমিনিক রাব কয়েকটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি এমন এক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর অসুস্থতা সত্ত্বেও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের অসুস্থতা যদি আরও গুরুতর রূপ নেয় এবং তিনি সরকারের কাজকর্ম চালাতে শারীরিকভাবে একেবারেই অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন কী ঘটবে?
এরকম পরিস্থিতির উদ্ভব হলে আসলে কী করতে হবে, ব্রিটেনের রাষ্ট্রাচারে সেই নিয়ম-কানুন স্পষ্ট নয়। এর একটা কারণ ব্রিটেনের কোনো লিখিত সংবিধান নেই। আর কোনো জাতীয় দুর্যোগের সময় এভাবে প্রধানমন্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, সে রকম নজিরও নেই।
বিবিসির রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার বার্নস বলছেন, আগামী কয়েকদিন এক্ষেত্রে সরকার কীভাবে কাজ করবে তার কিছুটা আভাস পাওয়া যেতে পারে ‘কেবিনেট ম্যানুয়াল’ দেখে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাজ এবং ভূমিকা এই ম্যানুয়ালে বর্ণনা করা আছে।
যেহেতু পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডমিনিক রাব হচ্ছেন ‘ফার্স্ট সেক্রেটারি অব স্টেট’, সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তিনিই তার কাজকর্ম দেখবেন। প্রধানমন্ত্রী যদি তার দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, ডমিনিক রাবই দায়িত্ব নেবেন।
কিন্তু তার মানে কী? একজন প্রধানমন্ত্রী যেসব কাজ করেন, যা যা করার ক্ষমতা তার আছে, ডমিনিক রাব কি তার সব কিছুই করতে পারবেন?
বিবিসির রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার বার্নস মনে করেন, রাব প্রধানমন্ত্রীর বেশিরভাগ কাজই চালিয়ে যেতে পারবেন কোনো সমস্যা ছাড়াই। যেমন বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন বিচারকদের বা চার্চ অব ইংল্যাণ্ডের উচ্চপদে নিয়োগের জন্য রাণীর কাছে সুপারিশ করা।
কিন্তু মন্ত্রিপরিষদে তিনি কোনো রদবদল আনছেন–এমন একটি পরিস্থিতি কল্পনা করা কঠিন, যদিও মনে হতে পারে তার সেই ক্ষমতা আছে। এমন সম্ভাবনা কম অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও।
বাস্তবে তাকে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে। তাকে পরামর্শ করতে হবে কেবিনেট সচিব এবং অন্যান্য সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে।
সামরিক সিদ্ধান্ত
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল অবস্থা দেখা দিতে পারে কোনো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে। জরুরি কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তাকে হয়তো সিদ্ধান্ত নিতেই হবে, তবে সেটি মন্ত্রিপরিষদের সিনিয়র সদস্যদের সম্মতির ভিত্তিতে হতে হবে।
এরকমই আরেকটি সংকটজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে। ব্রিটেনের কয়েকটি পরমাণু অস্ত্রবাহী সাবমেরিন আছে। দেশ যদি আক্রান্ত হয়, তখন কী করতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখতে হয় এসব সাবমেরিনের কমান্ডারদের কাছে।
তবে বরিস জনসন যদি অনেক দীর্ঘ সময়ের জন্য কাজকর্ম চালাতে অক্ষম হয়ে পড়েন, অথবা নিজের পদ থেকে সরে না দাঁড়ান, ততক্ষণ ডমিনিক রাবকে এরকম চিঠি লিখতে হবে বলে মনে হয় না।
ডমিনিক রাবকে কী অন্য মন্ত্রীরা মানবেন?
এরকম প্রশ্ন এরই মধ্যে উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ডাউনিং স্ট্রিট থেকে যখন এমন বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, রাবই হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ডেপুটি, তখন কোনো কোনো মন্ত্রী তাদের সাক্ষাৎকারে গুরুত্ব দিচ্ছেন মন্ত্রিপরিষদে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার ওপর।
যদিও তিনি এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কনজারভেটিভ পার্টির একেবারে সুপরিচিত প্রথম সারির কেউ নন ডমিনিক রাব। তার বয়স ৪৬। চেক বংশোদ্ভুত ইহুদী শরণার্থী পরিবারের সন্তান তিনি, যারা ১৯৩৮ সালে সেখান থেকে পালিয়ে আসেন।
ডমিনিক রাব অক্সফোর্ড এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। ২০১০ সালে তিনি প্রথম এমপি হন। তিনি ছিলেন ব্রেক্সিটের কট্টর সমর্থক। আরেকটি মজার তথ্য হচ্ছে, তিনি কারাতে ব্ল্যাক বেল্টধারী।
কোনো কোনো রাজনৈতিক ভাষ্যকার এমন আশংকা প্রকাশ করতে শুরু করেছেন, কনজারভেটিভ পার্টিতে যেন নেতৃত্বের জন্য ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়ে না যায়। যদি সেরকমটি ঘটে, তা ব্রিটেনের বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।
প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে লন্ডনের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত সেইন্ট থমাস হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন আছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। সেখানে তাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে।
তবে তার অবস্থা স্থিতিশীল এবং ভালো আছেন বলে জানিয়েছেন তার এক মুখপাত্র। তার ভেন্টিলেটর (কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার যন্ত্র) লাগানোর প্রয়োজন পড়েনি।
