নেই আইনের বাস্তবায়ন চিকিৎসাসেবায় জিম্মি রোগীরা
দেশের সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাখাতে চলছে চরম অরাজকতা। রয়েছে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার অভাব। নেই পর্যাপ্ত তদারকি ও পরিদর্শন ব্যবস্থা। ফলে কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে এ খাত। তাই চিকিৎসাখাতে সেবাগ্রহীতারা রয়েছেন জিম্মিদশায়। নিশ্চিত হচ্ছে না মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা; বরং বিপুল আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তারা।
বিশ্লেষকদের অভিযোগ, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ উদাসীন। একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট সরকারি চিকিৎসাসেবায় নানামুখী অরাজকতা সৃষ্টি করে রোগীদের ঠেলে দিচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালের দিকে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নানা কৌশল নিচ্ছেন বেসরকারি হাসপাতাল মালিকরা।
তারা প্রভাবশালী রাজনীতিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের মালিকানায় অংশীদার বানাচ্ছেন। সরকারি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ নেই। তাই বেশি অর্থ খরচ করেও বেসরকারি চিকিৎসাসেবার দিকে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেখানেও মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যের কবলে পড়ছেন তারা।
চিকিৎসাসেবায় সরকারি-বেসরকারিখাতের প্রতারণা বন্ধের জন্য একটি কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছেন তারা। চিকিৎসাসেবার ওপরে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০১৮ একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
গবেষণা প্রতিবেদনটিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় বেসরকারি পর্যায়ের ৬৬টি হাসপাতাল এবং ৫০টি রোগনির্ণয় কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং এতে বেসরকারি চিকিৎসা খাতসংশ্লিষ্ট আইন ও নীতি পর্যালোচনা, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, এসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাসেবা, বেসরকারি চিকিৎসাসেবার বিপণনব্যবস্থা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং তদারকির বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতে বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা প্রকট এবং বেসরকারি চিকিৎসাসেবায় সরকারের যথাযথ মনোযোগেরও ঘাটতি রয়েছে। এতে একদিকে এটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে কিছু ব্যক্তির এ খাত থেকে বিধিবহির্ভূত সুযোগ-সুবিধা আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১১৬টির মধ্যে ৯৭টি প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়নি। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রধান আইন ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স ১৯৮২’ প্রণয়নের পর এখন পর্যন্ত হালনাগাদ (আপডেট) করা হয়নি। এ আইনের কোনো বিধিমালাও করা হয়নি। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় বেসরকারি চিকিৎসাসেবা আইনের খসড়া নিয়ে কাজ করা হলেও তা এখনো আইন হিসেবে প্রণয়ন করা হয়নি।
অথচ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী জনসংখ্যার প্রায় ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নেন।
সুতরাং এ খাতের ভয়াবহ চিত্র নিশ্চয়ই দেশবাসীর এবং বিশেষ করে এখাত থেকে সেবাগ্রহণকারীদের জন্য উদ্বেগজনক এবং আতঙ্কেরও বটে। বাস্তবতা হচ্ছে, বেসরকারি চিকিৎসাখাতে সরকারি পর্যায়ে তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাব থাকায় এখাত থেকে সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে উচ্চ মুনাফা অর্জন করছে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক। মূলত এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক তাদের বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা না করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়েছে।
শুধু বেসরকারি পর্যায়েই নয়, সরকারি পর্যায়েও দেশের চিকিৎসাসেবার চিত্র খুব একটা সন্তোষজনক নয়। ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে চিকিৎসক ধরে রাখার জন্য এমপিদের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেছিলেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এর আগে ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে অবহেলাকারী চিকিৎসকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলাজনিত অপরাধের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সে সতর্কতাও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দেশের চিকিৎসা সেবায় হ-য-ব-র-ল অবস্থা রয়ে গেছে।
রাষ্ট্রের কাছে জনগণের অন্যতম মৌলিক চাহিদার একটি হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। আর স্বাস্থ্য মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত।
সংবিধানের ১৫ (ক) এবং ১৮ (১)- অনুচ্ছেদে চিকিৎসাসেবা এবং জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আর মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম, যা সবাই জানেন।
আর চিকিৎসা নামের এ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে এ দেশের জনগণকে কম হয়রানির শিকার হতে হয় না, বিশেষ করে তারা যদি কোনো সরকারি হাসপাতালে যান। এ দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি আজ আর কোনো নতুন বিষয় নয়।
মফস্বল পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা, হাসপাতালের অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগী ও তাদের স্বজনদের দালাল কর্তৃক প্রতারিত হওয়া, চিকিৎসা সরঞ্জামাদির অভাব, ডাক্তার সংকট, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি গায়েব করা, অধিক অর্থের লোভে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে চিকিৎসকদের প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখতে অধিক মনোযোগী ও যত্নবান হওয়া, সরকারি হাসপাতালে রোগীর সেবার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অবহেলা ও আন্তরিকতার অভাব, ভুল চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয় নিত্যদিনের অভিযোগ।
অন্যদিকে চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটলে বা আঘাত পেলে তার জন্য আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটা বা ক্ষতি হওয়ার ক্ষেত্রে এ দেশে আইনের তেমন একটা প্রসার ও প্রয়োগ ঘটেনি। তাছাড়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতাও খুব কম।
ফলে চিকিৎসকের গুরুতর অবহেলার কারণে অনেক সময় রোগীর মৃত্যু ঘটলেও বা রোগী মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়লেও চিকিৎসকরা খুব সহজেই পার পেয়ে যান। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারায় উল্লেখ আছে, কোনো ব্যক্তির অবহেলাজনিত কারণে যদি কারো মৃত্যু ঘটে, তবে ওই ব্যক্তিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা অথবা দুটোই একসঙ্গে শাস্তি হিসেবে দেওয়া যাবে। চিকিৎসকের অবহেলার জন্য দণ্ডবিধির আওতায় এবং টর্ট (দেওয়ানি প্রতিকার) আইনের আওতায় মামলা করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণই সচেতন নন।
অবহেলার সরাসরি প্রমাণ রয়েছে-এমন ক্ষেত্রেও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যদি ক্ষতিগ্রস্ত রোগী বা রোগীর অভিভাবক আইনগত ব্যবস্থা নিতে না চান। প্রথম থেকেই তাদের ধারণা জন্মে যে, এ জন্য কিছুই হবে না। আর এ বিষয়ে আইনের অগ্রগতিটাও এ দেশে তেমনভাবে হচ্ছে না।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে তাদের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে অনেক মামলা হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে ভারতের আদালত এসব মামলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রোগী বা ব্যক্তির উপকারও করেছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু বলেন, চিকিৎসাসেবা একটি মহন পেশা। কিন্তু কিছু সংখ্যক স্বার্থান্বেষী মানুষ এটাকে বাণিজ্যিক রূপে নিয়ে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
সরকারি হাসপতালে সেবা না পেয়ে অধিক অর্থব্যয় করে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন রোগী বা স্বজনরা। প্রতারাণার জাল এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে যে-সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, পল্লিচিকিৎসক ও মেডিকেল প্রতিনিধিদের মালিকানায় অংশীদার বানানো হয়।
এছাড়া পরিবার পরিকল্পনাকর্মী, ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতা, ধাত্রী, বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের রিসিপশনিস্ট, রিকশাচালক ও পেশাদার দালালদেরও রোগী নিয়ে আসার জন্য কমিশন দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এক কথায় ইচ্ছামতো চলছে এখাত। দেশব্যাপী কতগুলো অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে—তারও কোনো তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
তিনি বলেন, বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে একটি স্বাধীন কমিশন তৈরি করাটা সার্বিক দিক থেকেই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
সর্বোপরি, জনগণের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের মন-মানসিকতার ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন ঘটানো প্রয়োজন। প্রয়োজন অধিক অর্থের লোভ ও ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করা, দায়িত্ব-কর্তব্যে আন্তরিক ও সতর্ক হওয়া।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোভিড-এর কারণে স্বাস্থ্যখাতে দুই ধরনের দুর্নীতি প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমত : স্বাস্থ্যসেবা খাতে দুর্নীতি। দ্বিতীয়ত : স্বাস্থ্য অবকাঠামো খাতে দুর্নীতি। সরকারি প্রতিষ্ঠানে ক্রয় ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় এই খাতে দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি। আমরা এই করোনা সংকটের মধ্যেও সেই দুর্নীতি দেখেছি। বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাত স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও উচ্চ মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে খাতটির বিকাশ ঘটছে।
১৯৮২ সালের অধ্যাদেশের ওপর ভিত্তি করে এখাতের সেবা চলছে। ওই অধ্যাদেশে কোনো বিধিমালা না থাকায় বিভিন্ন সময় প্রণীত সরকারি নির্দেশের ওপর ভিত্তি করেই খাতটি পরিচালিত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সেবার মান ভালো হচ্ছে না। মালিকানাধীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের স্বচ্ছতা না থাকায় রোগীরা প্রতারিত হচ্ছে। এজন্য শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে হবে না। একটি কমিশন গঠন করতে হবে। ওই কমিশন সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা সেবার মান ও প্রতারণার বিষয়গুলো মনিটরিং করবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এখাতের বাজেট থেকে শুরু করে তদারিক ও নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা হয়েছে আমলানির্ভর। ফলে স্বাস্থ্যখাতের কোথায়, কী প্রয়োজন তার সঠিক পরিকল্পনা হয়নি। যেমন একজন ডাক্তারের বিপরীতে নার্স থাকতে হয় তিনজন। কিন্তু আমাদের আছে আধাজন।
সেবার মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞদের কাছে কোনো পরামর্শ বা পরিকল্পনা না করে অনেক প্রকল্পের কাজ শুরু ও শেষ হয়।
তা ছাড়া দেশের স্বাস্থ্যখাতে বাজেট কম হওয়ায় এই চিত্র এটা যেমন সত্য, তেমনি বাজেটের অধিকাংশ বরাদ্দ দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্যখাতের কোনো কাজে আসেনি। তাই স্বাস্থ্যসেবা দুর্নীতি মুক্ত করতে ও সেবার মান উন্নয়নে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত কমিশন জরুরি।
