• আজঃ বুধবার, ১৪ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং
  • English
ব্রেকিং নিউজঃ

নামের জোরেই নারাজ ট্রাম্প

যাঁরা বলেন, ‘নামে কী আসে যায়’, তাঁরা হয় ভুল বলেন, নয় তো জেনেশুনে মিথ্যা বলেন। নামে কী হয়? এ প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করা যায়, কী হয় না।

আজকাল চাকরি থেকে শুরু করে ব্যাংক ব্যালান্স, এমনকি সাজা মওকুফ পর্যন্ত কত কিছুই তো হচ্ছে নামের জোরে।

সে নাম নিজের হতে পারে, মা কিংবা বাবার হতে পারে, মামা কিংবা চাচা, এমনকি তস্য বন্ধু বা স্বজনের হলেও ক্ষতি নেই। কাজ হলেই হলো।

ওই যে বলে না, ‘নাম নাই যার, কাম নাই তার।’ কাম বলতে কাজ আর কি। যে কাজই করুন, তা দিয়ে নাম করা চাই। তা না হলে থাকল না কিছু। মুছে গেল।

কে চায় মুছে যেতে? ওই যে, ‘মরিতে চাহি না আমি এ সুন্দর ভুবনে।’

একটু গাঢ় করে ভাবলে ঠিকই বোঝা যায়, রক্তমাংসের শরীরটি নয়, আদতে নিজের চিহ্ন হিসেবে নামটি রেখে যেতে চাইছেন কবি।

তারই অমরত্ব খুঁজছেন। লিখতে জানা মানুষমাত্রই নিজের নামটি বারবার লেখে। খেয়ালে লেখে, বেখেয়ালে লেখে।

ক্যালিগ্রাফি করে নান্দনিক করে লেখে। সই-সাবুদের জন্য সংক্ষেপ করে লেখে। কেউ আবার গোটাকতক প্যাঁচ কষে আলাদা হতে চায়।

এই আলাদা হওয়ার স্পৃহাতেই একটা জীবন ছুটিয়ে চলে মানুষ। কারওটা ওই সই পর্যন্ত আটকে থাকে, কারওটা এগিয়ে যায় আরও কিছু।

আবার কেউ আছে, এত কিছুতে মন না দিলেও ঠিকই নাম করে ফেলে।

এমনকি নিজের নাম সই করতে না জানলেও তাকে বাধা দেওয়ার সাধ্য কারও থাকে না।

সবাই নাম করতে চায়। সবাই বলতে মনুষ্য প্রজাতি আর কি। কেউ কেউ আবার শুধু ব্যক্তি হিসেবেই নয়, তার চারপাশকে নিয়েই নাম করতে চায়।

আবার এই মানুষের কল্যাণেই বস্তু থেকে শুরু করে ধারণাগুচ্ছ পর্যন্ত ‘নামকরা’ হয়ে উঠতে পারে। আবার মানুষের পৃথিবীতে দ্রব্যগুণে নিষ্প্রাণ বস্তুও নাম করে। যেমন কুমিল্লার রসমালাই।

কে কার নাম করল এখানে? কুমিল্লা রসমালাইয়ের, নাকি রসমালাই কুমিল্লার? বিষয়টা বুঝতে হলে রসমালাই চেখে দেখা ছাড়া আর গতি কী? যথাযথ রসমালাই পাতে না পড়লেই বুঝতে হবে, এই বস্তু কুমিল্লার নামে চালিয়ে দেওয়া। সে যা-ই হোক, কথা হচ্ছিল নাম নিয়ে।

নাম নিয়ে আমাদের কারবারের শেষ নেই। মা-বাবা চান সন্তান ‘নাম’ করুক। নাম না করলেও যেন ‘দুর্নাম’ না কুড়ায়। কেউ কেউ ‘সুনামের সঙ্গে’ বংশ পরম্পরায় ব্যবসা করেন।

কেউ আবার খুব ‘নামকরা’ বাড়ির লোক। আবার নিজের চেষ্টায় ও মেধার জোরে ‘নাম কুড়ানো’ লোকেরও অভাব নেই। আবার কর্মদোষে ‘বদনামি’র ভার বহন করা লোকও কম নেই। ‘

নামজারি’ নিয়ে মামলার কথা না হয় ঊহ্যই থাকল। সে যা-ই হোক, জীবনটা জুড়েই যেন নামের কারবার।

সন্তান হলো, তো মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, এমনকি পাড়া-প্রতিবেশী সবাই উচাটন হলো—কী নাম রাখা যায়? ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে থেকেই, বিশেষত মা-বাবার মধ্যে কত রকম ভাবনা থাকে সন্তানের নাম নিয়ে।

এই নাম রাখা নিয়ে মন কালা হওয়ার ঘটনাও হামেশাই ঘটে। এই নাম রাখারও রয়েছে নানান রকম রীতি। অঞ্চলভেদে রয়েছে নানা আকর্ষণীয় আনুষ্ঠানিকতা। নাম রাখার রেওয়াজও একেক অঞ্চলে একেক রকম।

ইতালিতে নামের সঙ্গে জন্মস্থানের নামটি জুড়ে দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে আবার বংশ-নাম খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই বংশ–নাম এখন যেমনই হোক, মুখ্যত ছিল ক্রিয়া (পেশা) নির্ভর। এখানকার মানুষের অবশ্য নামের আবার দুটি অংশ থাকে।

একটি কাগজপত্রের নাম, যা সাধারণত একটু কেতাদুরস্ত থাকে। সঙ্গে থাকে একটি করে ডাকনাম। মূলত কাছের লোকদের জন্য তোলা থাকে এ নাম।

শুধু এই অঞ্চলের মানুষের নাম রাখা ও এর রীতি এবং এর ক্রমবিবর্তন নিয়েই বিরাট আলাপ ফাঁদা সম্ভব।

ফলে এই যে ‘নাম’, এ কিন্তু সহজ কিছু নয় মোটেই। কোনো কিছুর নাম বলামাত্রই সে জিনিসটি আমাদের চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে।

যেমন ‘কলম’ বললেই এমন এক বস্তুর কথা মনে হবে, যা দিয়ে লেখা যায়। সভ্যতায় কলমের ভূমিকার কারণে এই নামটিরও আছে কেমন একটা পবিত্র ভাব। আবার একেক কলমের রয়েছে একেক ব্যঞ্জনা।

কলমের নামটি যদি হয় ‘ইকোনো’ (মূলত পণ্যের নাম), তবে এই দেশের অনেক ত্রিশোর্ধ্ব মানুষের মনে তাদের শৈশব-কৈশোর এসে হানা দিতে পারে। আবার কোনো কোনো নাম ব্যক্তি বা বস্তুর চেয়ে ভাবকেই প্রধান করে তোলে।

নামের জোরে ‘শুভ’ নামের লোকেরা এমনকি ‘শুভ’ কিছু করার আগেই কেমন ‘শুভ’ ভাব ছড়ায়। একই কথা ‘শুভ্র’ নামের ক্ষেত্রেও। অন্যদিকে ‘বিজন’ নামটি কেমন একা বসে থাকে। মনে হয় ওই দূরে ঘাসের পিঠে কে যেন বসে আছে; একা।

আবার ‘শেফালি’ কি ‘শিউলি’ শুনলেই মনে হয়, কুড়াতে যাই। বেশ শুভ্র-স্নিগ্ধ একটা ব্যাপার আছে নাম দুটির সঙ্গে জড়িয়ে। ‘দীপ্ত’ বা ‘দীপ্তি’ আলো ছড়ায় নামের গুণেই। ‘

সুরঞ্জনা’ শুনলে যেমন নিষেধ ডিঙিয়ে চলে যাওয়া মেয়েটির কথা মনে পড়ে, ঠিক তেমনি ‘নিখিলেশ’ শুনলেই মনে হয় জীবন বদল হয় নাকি? আবার ‘সাগর’ নামটি শুনলেই কেমন ফেনিল জলরাশির শব্দ ও ছবি এসে মনের ঠিকানায় জমা পড়ে।

তা ‘নাম’ ব্যাপারটি এল কী করে? কাউকে বা কোনো কিছুকে চিহ্নিত করতে এই যে একটি শব্দ বা একাধিক শব্দের ব্যবহার, একে নামই-বা বলা হচ্ছে কেন? এ কিন্তু খুব মজার বিষয়।

বাংলায় যাকে আমরা ‘নাম’ বলছি, ইংরেজিতে তা-ই ‘নেম’। অনলাইন এটিমোলজি ডিকশনারিতে বলা হচ্ছে, এই ‘নেম’ শব্দটি আবার এসেছে প্রাচীন ইংরেজি ‘নামা’ থেকে। এর সঙ্গে মিল রয়েছে আবার সংস্কৃত ‘নামা’, প্রাচীন অভিজাত জার্মান ‘নামো’, লাতিন ‘নমেন’, গ্রিক ‘অনোমা’ ও ফারসি ‘নাম’ প্রভৃতির।

এই সবই আবার একই উৎস থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ বলা হচ্ছে, ‘নাম’ শব্দটি বৈদিক যুগের। শুধু এখানে কেন, এই ‘নাম’-কে হিন্দি, উর্দু, ডাচ, আফ্রিকানসহ অনেক ভাষাতেই ‘নাম’-ই বলা হচ্ছে।

আরব অঞ্চলসহ কিছু অঞ্চলের ভাষা বাদ দিলে বাকি প্রায় সব ভাষাতেই ‘নাম’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে একই ধরনের শব্দের ব্যবহার বেশ লক্ষণীয়। কিছু উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন জাপানিজে বলা হচ্ছে ‘নামায়ে’।

একইভাবে ‘নোম’, ‘নম’, ‘নামো’ ইত্যাদির ব্যবহার দেখা যায় কাতালান, ফরাসি, ওল্ড স্যাক্সন, ইতালিয়ান, পর্তুগিজসহ আরও অনেক ভাষাতেই।

ফিনিশ ভাষায় এই নামকে যে ‘নিমি’ বলা হয়, তাও ‘নাম’-এর খুব কাছাকাছি।

এ তো গেল নামের আদি ঠিকুজির আলাপ। কিন্তু সবাই এই ‘নাম’ শব্দটিকেই কেন বেছে নিল-প্রশ্নটির তো কোনো মীমাংসা হলো না।

নিশ্চয় বিষয়টি কোনো ভাষাতাত্ত্বিক ভেবে দেখবেন। বরং নাম নিয়ে নানা কারবারের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক।

নাম নিয়ে কারবারের কি কোনো শেষ আছে? এই এক নাম নিয়েই তো হাজার হুজ্জত। কে বলতে পারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামটি ‘ট্রাম্প’ না হয়ে অন্য কিছু হলে তিনি সহজে পরাজয় স্বীকার করতেন কি না।

কারণ, ট্রাম্প শব্দটি যে ‘ট্রায়াম্ফ’ শব্দ থেকে এসেছে, তার অর্থই তো ‘সাফল্য’ বা ‘বিজয়’। তাই নামের জোরেই হয়তো তিনি এখনো নিজেকে ‘জয়ী’ হিসেবেই দেখতে চাইছেন।

অন্য কোনো কিছুই তো তাঁর নামের সঙ্গে মানানসই নয়। আর যে জো বাইডেন এখনো ধৈর্য সহকারে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য অপেক্ষা করছেন, তাঁর নামের তত্ত্বতালাশ না হয় বাকিদের জন্য তোলা থাকল।

নাম নিয়ে কারবার কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কেউ কেউ একটি নিরীহ-গোবেচারা নামকেই এমন করে তোলেন যে বিড়ম্বনার আর শেষ থাকে না।

নামেরই ‘দুর্নাম’ হয়ে যায়। আবার কারও কারও অর্জিত ‘সুনামের’ ভাগ যুগ যুগ ধরে পায় তাঁর অঞ্চল ও তাঁর অধিবাসীরা। কেউ আবার একটা ‘নামমাত্র’ জীবন পার করে দেয় হেলায়। ‘

নামমাত্র’ বোঝা গেল তো? ওই যে বিজ্ঞাপনের ‘নামমাত্র দাম’। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট পণ্যের দামটা এতই কম যে নামেই শুধু তা ‘দাম’। আছে ‘নামজপের’ ব্যাপারও। কীর্তি যদি অত বড় হয়, তবে ‘নামজপ’ হতেই পারে।

এমনকি প্রেমেও ‘নামগান’ করা যেতে পারে। ওই যে শিল্পী কালিকাপ্রসাদের সেই গান ‘আমি তোমারই তোমারই তোমারই নাম গাই’। অবশ্য এ নাম কার, তা নিয়েও বিস্তর আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

আবার বিরহবেদনায়ও চলতে পারে এই নামগান। দুজনার বাড়ির মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘সরু নদী’ কখনো ‘অকূল জলধি’ হয়ে উঠলে বিরহী প্রাণ ‘নাম লইয়া’ কেঁদে উঠতেই পারে। সেই কান্না সজল করে তুলতে পারে শ্রোতামাত্রকেই।

অথচ এই যে এত এত নামের কারবার চলছে, এর সবই কিন্তু মানুষের। অথচ কত লক্ষ প্রাণ এই পৃথিবীতে। কিন্তু গৃহপালিত ছাড়া আর কোন প্রাণীটির নাম আমরা দিই বা মনে রাখি।

সবার সৌভাগ্য তো আর গ্রিক বীর আলেক্সান্ডারের ঘোড়া ‘বুসিফেলাস’ বা সেই ছলনার হাতি ‘অশ্বত্থামা’-এর মতো নয় যে ইতিহাসে ঠাঁই করে নেবে। মানুষের কাছে সব আমগাছই আমগাছ কিংবা সব বটই বট। কোনো আলাদা নাম নেই।

অথচ ভেতর উঠানের গাছটির চেয়ে ওই দূরে দিঘির পাড়ের গাছটির আম হয়তো বেশিই মিষ্টি। তাতে আমাদের কী বা আসে যায়।

দুটিকেই আমরা আমগাছই বলি। প্রিয় পোষা প্রাণী বা প্রিয় গবাদি ছাড়া কারই-বা নাম জুটেছে কপালে। তাদের নিজস্ব আলাপের দুনিয়ার কথা অবশ্য আলাদা। নিজের নাম নিয়ে যে মানুষ এত সচকিত, চারপাশ নিয়ে সে কতই না উদাসীন!

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

January 2021
FSSMTWT
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031