ব্রেকিং নিউজঃ

২৮ বছর পর বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার রায় আজ

প্রায় ২৮ বছর পর আজ বুধবার ভারতের আলোচিত বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার রায় ঘোষণা হবে আজ। রায় দেবেন দেবেন দেশটির উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের লক্ষ্ণৌয়ে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো-সিবিআইর বিশেষ আদালত।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস করেছিল করসেবকরা। তাদের দাবি ছিল, ওই স্থানে রাম মন্দির ছিল। ঘটনার পর লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলিমনোহর জোশি, উমা ভারতীর মতো বিজেপি নেতা-নেত্রীর বিরুদ্ধে বাবরি মসজিদ ধ্বংসে প্ররোচনা দেওয়ার মামলা দায়ের হয়। সেই মামলার তদন্ত করছে সিবিআই। বিশেষ সিবিআই আদালতকে রায়দানের জন্য (আজ) ৩০ সেপ্টেম্বর ডেডলাইন দিয়েছিলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ১০ মাস পর অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় সিবিআই। চার্জশিটে ভারতীয় রাজনীতির প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে নাম ছিল লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলি মনোহর জোশি ও উমা ভারতীর। এ ছাড়া উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং, বিজেপি নেতা বিনয় কাটিয়ার, সাক্ষী মহারাজ, ভিএইচপি নেত্রী সাধ্বী ঋতম্ভরা এবং রাম জন্মভূমি ট্রাস্টের সভাপতি নৃত্য গোপাল দাস ও সম্পাদক চম্পত রাইয়ের নামও চার্জশিটে দেয় সিবিআই। সবমিলিয়ে ৪৮ জন ছিলেন অভিযুক্তের তালিকায়। দীর্ঘ ২৮ বছর মামলা চলাকালে অভিযুক্তদের মধ্যে ১৬ জন এরই মধ্যে মারা গেছেন। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ব হিন্দুপরিষদ নেতা অশোক সিঙ্ঘল, গিরিরাজ কিশোর, বিষ্ণুহরি ডালমিয়া ও শিবসেনা সুপ্রিমো বাল ঠাকরে।
সিবিআই আদালতের বিচারক এস কে যাদব গত ১৬ সেপ্টেম্বর নির্দেশ দিয়েছিলেন, রায়দানের দিন জীবিত ৩২ জন অভিযুক্তকেই আদালতে হাজির থাকতে হবে।
অভিযুক্তদের মধ্যে কল্যাণ সিং ও উমা ভারতী—দুজনেই করোনায় আক্রান্ত এবং হাসপাতালে চিকিত্‍সাধীন। তাই তাঁরা আদালতে উপস্থিত থাকবেন কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। এই সংবেদনশীল মামলার রায়কে ঘিরে যাতে আইনশৃঙ্খলার কোনো রকম অবনতি না হয়, তার জন্য উত্তরপ্রদেশে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। লক্ষ্ণৌ ঢোকার সব প্রবেশ পথে কড়া তল্লাশি চলছে। একইসঙ্গে সাদা পোশাকের পুলিশও মোতায়েন করা হয়েছে।
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, চলতি বছরের ৩১ আগস্টের মধ্যে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার রায় দিতে হবে। পরে বিশেষ সিবিআই কোর্টের বিচারকের অনুরোধে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রহিনটন এফ নরিমানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আগের ডেডলাইন আরো বাড়ানোর নির্দেশ দেন।
এরও আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাকে ২০১৭ সালের এপ্রিলে ‘ভারতের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার অধ্যায়কে নাড়িয়ে দিয়েছে’ আখ্যা দেন আদালত। এল কে আদভানিসহ একাধিক ব্যক্তি ও করসেবকের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সিবিআই আদালতকে নির্দেশ দেন, দুই বছরের মধ্যে শুনানি শেষ করে রায় দিতে হবে।
গত মাসে এই মামলায় সিবিআই ভিডিও কনফারেন্সে প্রবীণ বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি ও মুরলি মনোহর জোশির বয়ান রেকর্ড করে। দুজনেই তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তাঁরা দাবি করেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় তাঁরা জড়িত ছিলেন না। উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং-ও অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন।
আটাশ বছরে নানা নাটকীয় টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলা। ঘটনার পর সাবেক ফৈজাবাদ জেলায় পুলিস দুটি এফআইআর দায়ের করে। ১৯৭ নম্বর এফআইআরে অজ্ঞাতপরিচয় লাখো করসেবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। লক্ষ্ণৌর আদালতে শুরু হয় মামলা। আর, ১৯৮ নম্বর এফআইআরে আদভানি, জোশি, উমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করা হয়। রায়বরেলির আদালতে শুরু হয় মামলা। তদন্ত শুরুর পর ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে দুই মামলায় যৌথ চার্জশিট দেয় সিবিআই। মোট ৪৮জন নেতার বিরুদ্ধে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাও মসজিদ ধ্বংসে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনে। এরপর ২০০১ সালে আদভানিসহ ১৪ জন নেতাকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে মুক্তি দেন নিম্ন আদালত।
এরপর ২০০৩ সালে সিবিআই আরেকটি চার্জশিট দিলেও, রায়বরেলির আদালতের নির্দেশে প্রমাণ না থাকায় ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ছাড়াই আদভানিদের বিরুদ্ধে এগোতে থাকে মামলা। ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টও নিম্ন আদালতের নির্দেশ বহাল রেখে, আদভানিদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে মুক্তি দেন। ২০১১ সালে করা সিবিআইর আবেদনের ভিত্তিতে ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়। আদভানিসহ ১৪ জন নেতার বিরুদ্ধে ফিরে আসে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে লক্ষ্ণৌর সিবিআই আদালতে করসেবকদের বিরুদ্ধে এবং আদভানিদের বিরুদ্ধে দুটি মামলার একসঙ্গে শুনানি শুরু হয়। প্রায় তিন দশক পর গত ১ সেপ্টেম্বর শেষ হয় সেই শুনানি।
এর আগে ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, নিয়মিত শুনানি করে দুই বছরের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। একাধিকবার সে সময়সীমা বাড়ানো হয়। মামলা শেষ করতে লক্ষ্ণৌর আদালতের বিচারক সুরেন্দ্র কুমার যাদবের অবসরের দিন পিছিয়ে দেন শীর্ষ আদালত। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন আদভানি, জোশিরা। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, সংঘর্ষে উসকানি, ফৌজদারি ষড়যন্ত্রসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হন তাঁরা। লক্ষ্ণৌর আদালতে নিজেদের বয়ানে আদভানি ও জোশি দাবি করেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্যই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। করোনা পরিস্থিতিতে ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষ্য দেন তাঁরা। আর, উমা-কল্যাণরা সশরীরে হাজিরা দেন। তবে, কল্যাণ সিং ছাড়া কেউই নিজেদের নির্দোষ প্রমাণে কোনো নথি দেননি। মসজিদ ধ্বংসের জন্য ফাঁসি দেওয়া হলেও নিজেকে ধন্য মনে করবেন বলে আদালতের বাইরে মন্তব্য করেন উমা ভারতী।
আদভানি, জোশিরা সব অভিযোগ অস্বীকার করলেও লিবেরহান কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয় বাবরি মসজিদ ধ্বংস না ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, না ছিল অপরিকল্পিত।
অন্যদিকে, গত বছর নভেম্বরে অযোধ্যায় রামমন্দিরের পক্ষেই রায় দেন সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু, সেখানেও শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে, বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়। বাবরি মসজিদ ধ্বংসে ভাঙা হয় আইন। হিসাব কষেই নষ্ট করে দেওয়া হয় মানুষের উপাসনাস্থল। বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলায় ৩৫০ জনের সাক্ষ্য শুনেছেন নিম্ন আদালত। খতিয়ে দেখা হয় প্রায় ৬০০ নথি। ইতোমধ্যে কেটে গেছে তিন দশক। মূল মামলা উচ্চ আদালতে গড়ালে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে কতদিন লাগবে, সে প্রশ্নই এখন ঘুরছে সব মহলে। এ ছাড়া অযোধ্যা জমি বিতর্কে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কোনো প্রভাব বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মামলায় পড়ে কিনা, তা নিয়েওন নানা মহলে চলছে জল্পনা।

 

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

July 2026
F S S M T W T
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31