ব্রেকিং নিউজঃ

কঠোর লকডাউনও থামাতে পারেনি বেপরোয়া চলাচল

দেশে আবারো দ্রুত বাড়ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকাকে রক্ষায় আশপাশের সাত জেলাসহ সীমান্তের বিভিন্ন জেলায় চলছে লকডাউন। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ লকডাউন কার্যকরে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তারপরও থামানো যাচ্ছে না সাধারণ মানুষের বেপরোয়া চলাচল। বিভিন্নভাবে তারা প্রবেশ করছে রাজধানীতে। আর স্বাস্থ্যবিধি মানতে সব স্থানেই দেখা যাচ্ছে উদাসীনতা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে পুলিশ প্রশাসনকে আরো কঠোর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার ইঙ্গিত মেলে বুধবার (২৩ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও। এতে জানানো হয়, ৫৪ দিন পর গতকাল দেশে করোনা সংক্রমণে সর্বোচ্চ মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে করোনায় মৃত্যু হয়েছে ৮৫ জনের, যা গত ২৯ এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। এছাড়া গত ৭২ দিনের মধ্যে গতকালই সবচেয়ে বেশি ৫ হাজার ৭২৭ জনের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। একদিনের হিসেবে এর আগে সর্বোচ্চ শনাক্ত হয়েছিল ১৩ এপ্রিল, ৬০২৮ জন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশে এ পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হয়েছে ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৮৭৭ জনের শরীরে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৩ হাজার ৭৮৭ জনের।

এদিকে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার থেকে ঢাকাকে সারা দেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এজন্য ঘোষণা দেওয়া হয় কঠোর লকডাউনের। এ জেলাগুলো হলো-নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী। এ অবস্থা চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত।

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ ঘুরে দেখা যায়, জরুরি সেবা ছাড়া অন্য কোনো পরিবহন বা ব্যক্তিকে ঢাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গাজীপুরেও প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি, ব্যক্তি কিংবা পরিবহন। আর আব্দুল্লাহপুর মোড়ে ঢাকার পরিবহনগুলো গতিপথ পরিবর্তন করে আবার ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্য পরিবাহী ট্রাক, পিকআপ টঙ্গী ব্রিজ পার হলেও বাধার মুখে পড়ছে পুলিশ চেকপোস্টে। কিন্তু বিভিন্ন কৌশলে সাধারণ মানুষ ঢুকছে রাজধানীতে। গাজীপুর শিল্প এলাকা বলে ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর অনুমতি চাইলেও আবেদনে সাড়া দেয়নি প্রশাসন। এজন্য অনেককেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। মানিকগঞ্জের ওপর দিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর কোনো যানবাহন চলতে দেওয়া হয়নি। আমিনবাজার ব্রিজে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়ে সাধারণ মানুষ। ব্রিজের দুই পাশে আটকে দেওয়া হয় যানবাহন। গাবতলীতে আটকে দেওয়া হয় ঢাকার অভ্যন্তরীণ গণপরিবহনসহ অন্যান্য পরিবহন। ওদিকে ব্রিজের অপর পাশে আমিনবাজারে আটকে দেওয়া হয় সাভারের বাসসহ অন্যান্য যানবাহন।

এদিকে লকডাউনে নিশ্চিতে প্রশাসন ও পুলিশের কঠোর অবস্থানের পরও থামানো যাচ্ছে না মানুষের চলাচল। তাই আশপাশের জেলাগুলো থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা যায়নি রাজধানী ঢাকাকে। নগরীর প্রবেশ পথগুলো থেকে যানবাহন ফিরিয়ে দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের প্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। দেশের ভিন্ন এলাকা থেকে এসে প্রবেশ পথে নেমে চেকপোস্ট পার হয়ে নগরীতে প্রবেশ করছেন তারা। লকডাউনের দ্বিতীয় দিন বুধবার প্রবেশ পথগুলো ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, দূরপাল্লার কোনো বাস প্রবেশ না করলেও মানুষ ঠিকই প্রবেশ করছে। সেখান থেকে যাত্রী নিয়ে রাজধানীতে আসা যাওয়া করছে বাসগুলো। প্রতিটি বাসই অতিরিক্ত যাত্রী বহন করছে। একই চিত্র দেখা গেছে গাজীপুর থেকে ঢাকামুখী সড়কের।

জানা যায়, টঙ্গী ব্রিজ পার হলে গাজীপুর যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ঢাকা থেকে গাজীপুরমুখী বাসগুলো আব্দুল্লাহপুর এসে ঘুরিয়ে নিলেও সাধারণ যাত্রীরা এই পাশে এসে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গাজীপুর চৌরাস্তা যেতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক বলেন, যারা গাজীপুর যাবেন তারা এখান থেকে সিএনজিতে উঠছেন। চৌরাস্তা পর্যন্ত কোনো ঝামেলা থাকে না। আবার ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটেও আব্দুল্লাহপুর হয়ে ভেতর দিয়ে মাইক্রো নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে।

শুধু চলাচলই নয় স্বাস্থ্যবিধি মানতে উদাসীনতা দেখা গেছে অধিকাংশের মাঝে। রাজধানীর পাড়া-মহল্লা, বাজার সর্বত্রই একই চিত্র। যদিও বাজার ও বিভিন্ন দোকানে ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’; ‘স্বাস্থ্য বিধি না মানলে মৃত্যুর ঝুঁকি আছে’ এই ধরনের কিছু সতর্কবাণী সংবলিত ব্যানার টানানো থাকে। কিন্তু মাস্ক না থাকলে সার্ভিস পেতে কাউকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে না। এদিকে রাজধানীতে হঠাৎ গণপরিবহন কমে যাওয়ায় বাসে উঠতে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে যাত্রীদের। এতে কোনোভাবেই বজায় থাকছে না সামাজিক দূরত্ব। আবার বাসগুলোতেও নেই যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো ব্যবস্থা। এ প্রসঙ্গে মিরপুর রুটে চলাচলকারী প্রজাপতি পরিবহনের হেলপার আজিজ জানান, মালিকপক্ষ না দিলে আমরা কি করব!

এমন পরিস্থিতিতে চলমান লকডাউন ও বিধিনিষেধ মানাতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর হতে অনুরোধ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।  করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ অনুরোধ করে। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভার্চুয়াল বুলেটিনে এ কথা বলেন অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন।

তিনি বলেন, ‘সংক্রমণ কমিয়ে আনার জন্য চলমান লকডাউন ও বিধিনিষেধকে কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য সকলকে অনুরোধ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনে কঠোর হতে  অনুরোধ করা হলো।’

বর্তমানে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে চলমান লকডাউন এবং বিধিনিষেধে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কিছুটা অসুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, কিন্তু সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা, হাসপাতালের প্রস্তুতি নিতে সুযোগ দেওয়া এবং মৃত্যু কমিয়ে আনার জন্য সকলকে এ সহযোগিতা করতে হবে। একইসঙ্গে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, আর এর ব্যত্যয় হলে বর্তমান পরিস্থিতি আরও শোচনীয় অবস্থায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

বর্তমানে করোনার রেড জোন হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে এক দিনে ফের সর্বোচ্চ মৃত্যুও ঘটনা ঘটেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে গত ৪ জুন হাসপাতালে করোনা সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের শয্যা বাড়ানো হয়েছে রামেক হাসপাতালে। ৩০৯টি থেকে শয্যা বাড়িয়ে ৩৫৭ টিতে উন্নীত করা হয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার রামেক হাসপাতাল ল্যাবে ১৮৮ জনের এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ পিসিআর ল্যাবে ৩৬৬ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে রামেক হাসপাতাল ল্যাবে ৩৫ ও রামেক ল্যাবে ১৪১ জনের নুমানায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষার অনুপাতে রাজশাহীতে সবচেয়ে বেশি ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। একই দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ নমুনায় করোনা ধরা পড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগের ১৩ জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ৯৬৭ জন। ময়মনসিংহ বিভাগে ১৪৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৩২ জন, রাজশাহী বিভাগে ৭৬৩ জন, রংপুর বিভাগে ২৫৮ জন, খুলনা বিভাগে ৯৯৮ জন, বরিশাল বিভাগে ৭১ জন, আর সিলেট বিভাগে শনাক্ত হয়েছেন ১১৩ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে খুলনা বিভাগে। এ বিভাগে মারা গেছেন ২৭ জন। এরপর রয়েছে ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগ। এই দুই বিভাগে মারা গেছেন ১৪ জন করে, চট্টগ্রাম বিভাগে মারা গেছেন ১০ জন, বরিশাল বিভাগে ২ জন, সিলেট বিভাগের ৩ জন এবং রংপুর বিভাগে মারা গেছেন ৬ জন।

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

June 2026
F S S M T W T
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930