আমাদের সমাজে দেন মোহর নিয়ে বেশ কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে
আমাদেৱ সমাজে মানুষগুলো ভাবে দেন মোহর বিয়ের আসরে দিতেই হবে, বাকি রাখা যাবে না। আবার অনেকে ভাবে এটা ডিভোর্স হলে এরপরে দিতে হয়। দুইটা ধারনাই ভুল।
কিন্তু আসল বিষয় হল, দেন মোহৱ এটা পাত্রীর স্বাভাবিক পাওনার মত, তবে খালওয়াতে সহিহাহ (নির্জনে দুজন একত্র হলে) এরপর এটা দেয়া ওয়াজিব হয়ে যায়।
স্বাভাবিক পাওনা মানে বাকিতে দোকান থেকে জিনিস কিনসেন বা ধার নিছেন ধরেন, এখন চাইলে আগেও চাইতে পারে, একমাস বা একবছর পরেও নিতে পারে, চাইলে সম্পূর্ণ বা আংশিক টাকা মাফও করে দিতে পারে। পাওনাদারের ইচ্ছা।
তবে ভাই! যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ করে দেয়া উচিত। বিয়ের দিনই যদি করেন, তবে আরও ভাল। সমস্যা নাই।
অনেকে ভাবে মোহরের ব্যাপারে শরিয়া কোনো সীমারেখা দেয়নাই। এটাও ভুল। সর্বনিম্ন সীমা ১০ দিরহাম (প্রায় ৩১ গ্রাম রূপা) এর সমমূল্য। টাকার হিসেবে সম্ভবত এখন সাড়ে ৩হাজার টাকার আশেপাশে হবে। মোহর নির্ধারনের সময় এর নিচে ধরলেও এটা দিতে হবে।
ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ের এক মহিলার ঘটনা শুনে অনেকে বলেন, সর্বোচ্চ যত ইচ্ছা মোহর চাইতে শরিয়া বাঁধা দেয় না, সুতরাং যত্তখুশি মোহর চাওয়া যাবে।
ভাল কথা। বিয়ের পর আপনার ভরণপোষণ হিসেবেও যা খুশি তা দেয়াও স্বামীর জন্য আবশ্যক করে নাই। একসেট জামা, আর প্রাণ বাচে এমন খাবার। চলবে?
এছাড়া আরও অনেক কিছুই বৈধ, জানেন আশা করি। সুতরাং শরিয়ার বিধানে ফাঁক খুঁজতে যাবেন না, বিপদে পড়বেন।
দেন মোহরে ফাতেমির ব্যাপারে অনেকে শুনেছেন। মানে ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহার বিয়ের সময় মোহর ছিল ৫০০দিরহাম, এর সমমূল্য। (১৫৩০.৯গ্রাম রুপার মূল্য, বাংলা টাকায় ১লাখ টাকার কিছু বেশি)।
এটা একটা ভাল এমাউন্ট। কিন্তু এটা আবশ্যক কিছু না। সালাফরা আমভাবে এর অনুসরণ করতেন, বা সাহাবাদের সময়েও সবাই এমন ধরতেন এমন কিছুই না। চাইলে ধরতে পারেন। অনেকে ধরে। এতটুকুই।
মোহরে মিসিল (পাত্রীর মোহর তার বোন বা ক্লোজ কাজিনদের মত হওয়া উচিত) এটা যারা বোঝেন, তারাও একটা ভুল ধারণা করেন। এটাও ভাই আবশ্যক কিছু না। চাইলে দুই পক্ষের সম্মতিতে এরচেয়ে বেশি বা কম ধরা যায়।
ছেলেদের জন্য বলি, ভাই!! আপনার সাধ্যের সর্বোচ্চ মোহর দিতে পারেন, কিন্তু সাধ্যের বাইরে যাবেন না। যে এলাকায় অতিরিক্ত মোহর নেয়ার বদরুসম আছে, সেখানে বিয়ের কথা কনফার্ম করার সময়ই মোহরের ব্যাপারে কথা বলবেন। নিজে বলতে লজ্জা পেলে ঘটক বা সিনিয়রদের মাধ্যমে বলতে পারেন।
অতিরিক্ত মোহরের ব্যাপারে বাধ্য করতে চাইলে আপনি আগেই না বলে দিবেন। অন্য কোথাও পাত্রি খুঁজবেন। ব্যস।
বিয়ের ডেট ঠিক করে, সব আয়োজনের পরে মোহরের জন্য ঝগড়া করে বিয়ে ভেঙে দেয়া দুঃখজনক ব্যাপার। আবার সাধ্যের বাইরে মোহর ধরে পরে আর না দেয়া এটাও খুব বাজে বিষয়।
অনেক সময় জিজ্ঞেস করলে মেয়ের পরিবারই একদম কম মোহর বলে, (অনেকে বলে, আমাদের বিশেষ কোনো দাবি নাই। বা দিলেই হল, সমস্যা নাই। ১০-২০ হাজার দিও।
ইত্যাদি) সেক্ষেত্রে আপনার যদি সামর্থ্য থাকে, তাহলে এরকম কম দেয়া উচিত হবে না। আপনি নিজ দায়িত্বে বাড়িয়ে দিবেন।
মুমিনের জন্য বিয়ে হল অনন্তকালের একটা বন্ধনের শুরু। এটাকে ভালোবাসার সাথেই সমাধান করা উচিত। মোহর কম দিয়ে জিতলাম, বেশি নিয়ে জিতলাম, এমন চিন্তা থাকলে ভাই ফুটপাতে দোকানদারি করেন। বিয়ে করতে আসছেন কেন।
সব অধিকার কড়ায়গণ্ডায় আদায় করলে সেখানে ভালবাসার অবদান থাকলো কই। পুরাতন কথা আবারও বলি, বিয়ের ক্ষেত্রে কিছু সিদ্ধান্ত আপনাকে স্ট্রিক্টলি নিতে হবে। নয়তো দ্বীন-দুনিয়া দুই দিকেই আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এক্ষেত্রে কিছু মানুষ অসন্তুষ্ট হলে হোক, পরে গল্প করে – দাওয়াত খাইয়ে খুশি করে দিবেন, কিন্তু বিয়ের সময় স্ট্রিক্ট থাকবেন।
হয়তো আপনি বিয়ের আয়োজনের কর্তৃত্ব আপনার হাতে রাখবেন। অথবা সারাজীবন আফসোস করবেন। সিদ্ধান্ত আপনার।
প্ৰায় একবছর পর এই সিরিজে লেখলাম। আর যেহেতু এখানে পার্সোনাল আলোচনা নাই, এজন্য মনে হল এটার পাবলিক করা যায়।।
