ব্রেকিং নিউজঃ

মিঠে কড়া সংলাপ গত পঞ্চাশ বছরের পাঁচালি

আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। নানা চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি।

রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা সফলতাও অর্জন করেছি; কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষেত্রের দৈন্য এবং ব্যর্থতা আজও আমরা ঘোচাতে পারিনি।

এক্ষেত্রে ব্যর্থতা বলতে আমি রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আচার-আচরণ, শ্রদ্ধাবোধ, নির্বাচন অনুষ্ঠান ইত্যাদি বিষয়ের কথা বলতে চেয়েছি।

স্বাধীনতার উষালগ্ন থেকেই আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৈরিতা, রেষারেষি লেগেই আছে এবং কখনো কখনো তা এমন চরম আকার ধারণ করে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না।

বিশেষ করে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের কলহ-বিবাদের ফলাফল জনজীবনকে এমনভাবে বিষিয়ে তোলে, যার ফলে সাধারণ মানুষের অবস্থা দাঁড়ায়, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’!

কিন্তু তারপরও সরকারি ও বিরোধী দল ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ অবস্থায় জনগণের দুঃখ-দুর্দশা বাড়িয়েই চলে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে আজ অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসব কথা লিখতে হচ্ছে। কারণ এতদিনেও আমাদের রাজনৈতিক কালচারে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি।

পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, স্বাভাবিক সৌজন্য রাজনীতি থেকে উধাও হয়ে গেছে। স্বার্থ হাসিলে এখানে কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা-সৌজন্য প্রদর্শন করছেন না।

এ অবস্থায় আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড দেখলে প্রতিমুহূর্তে মনে হয়, এই বুঝি আবার অশান্তি, হানাহানি, মারামারি শুরু হয়ে গেল।

কারণ, একদল অপর দলকে সব সময় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। সরকারি দল বিরোধী দলের উদ্দেশে বলছে, বিরোধী দলের আন্দোলনের ক্ষমতা নেই! জবাবে বিরোধী দল জানান দিচ্ছে, এই তারা আন্দোলন শুরু করলেন বলে।

আবার প্রতিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেই এদেশে এমন কিছু করা হয় বা এমন কিছু ঘটানো হয়, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দেয়।

বর্তমানকালের নির্বাচনি যুদ্ধে কোণঠাসা অবস্থায় পড়ে থাকা বিরোধী দল সরকারি দলের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে হইচই অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে সরকারি দলও এসবে পাত্তা না দিয়ে তাদের বিজয় ডঙ্কা বাজিয়ে চলেছে।

আর এসব নির্বাচনে এমন সব কাজও করা হচ্ছে, যা প্রশ্নের মুখে পড়ে গোটা নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফলে দেশের মানুষ নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে দিনে দিনে ভোট প্রদানের আগ্রহ পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট কেন্দ্রে না গিয়ে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি তাদের অনাস্থা প্রকাশ করছেন।

দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ধ্বংস করতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন।

তবে এক্ষেত্রে শুধু বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে অতীতের সবকিছু ভুলে যাওয়াও ঠিক হবে না। বরং অতীতের নির্বাচন কমিশনগুলোর ধারাবাহিকতাতেই যে বর্তমান নির্বাচন কমিশন ভুল করে চলেছে,

সে কথাটি উল্লেখ করা প্রয়োজন বলেই মনে করছি। কারণ অতীতেও এমনটি দেখা গেছে, ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভোট কাস্টিং দেখিয়ে বিবিসির মতো সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার মুখে প্রিসাইডিং অফিসারদের ডেকে নিয়ে তা সংশোধন করিয়ে ৫০, ৬০ শতাংশে নামানো হয়েছে! অর্থাৎ সময়ে সময়ে নির্বাচন কমিশনকে ঠুঁটো জগন্নাথ হতে দেখা গেছে।

অতীতে বিবিসির মতো সংবাদমাধ্যম এ বিষয়ে নাক গলানোর ফলে এ দেশে একটি সরকারকে ভোট কাস্টিংয়ের হার কমিয়ে ফেলতে হয়েছিল।

অথচ সারা দিন ধরে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে পোলিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসারদের ওপর চড়াও হয়ে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে ভোটের বাক্স ভরে ফেলা হয়েছিল।

আর এভাবে জোর করে ভোটের বাক্স ভরতে দেখে সেদিন একজন ভোট ডাকাতকে প্রশ্ন করায় সে বলেছিল, ‘নিজেদের তারা সেরা প্রমাণ করতে চায়’!

এ অবস্থায় আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, ভোটের দিন, ভোট ডাকাতরা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে যা করার, তা-ই করে থাকে।

আর নির্বাচন কমিশনও তা জানে না বা বোঝে না এমনটি নয়। সুতরাং নির্বাচন কমিশনের ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া এক্ষেত্রে দেশ ও জাতির রক্ষা নেই।

নির্বাচন কমিশন যদি তাদের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তাহলে অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না। ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি চলতেই থাকবে।

আর তখন রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শেষ ভালো মানুষটিও সরে দাঁড়াবেন।

ফলে অবস্থা যা হওয়ার তা-ই হবে। রাজনীতি হান্ড্রেড পার্সেন্ট কলুষিত হয়ে পড়বে।

নষ্ট হতে হতে যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটুকুও রাজনীতি করে খাওয়া লোকদের জবরদখলে চলে যাবে। সুতরাং, সাধু সাবধান!

বর্তমান অবস্থায় নির্বাচন কমিশনকে আমরা যতই দোষারোপ করি না কেন, শেষমেশ নির্বাচন কমিশনকেই বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটি বাঁধতে হবে।

আর নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দেশের বিশিষ্টজনরা যে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন, তাদের সে কাজটিও নেতিবাচক দৃষ্টিতে না দেখে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখাই ভালো হবে।

কারণ, বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ভালো কিছু না হলে তাদের সরিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা যেতেই পারে। এক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিতে ভেবে দেখতে হবে, বর্তমান কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না।

আর জনগণের আস্থা থাকলে তারা ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন না কেন, সে বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। মোট কথা, অতীতের ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনকে ঠুঁটো

জগন্নাথ বানিয়ে রাখা ঠিক হবে না। কারণ অতীতে যারা এ কাজটি করে ফায়দা লুটেছেন, বর্তমানে তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন।

তাদের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকিয়ে সেখান থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত হবে বলে মনে করি।

পরিশেষে বলতে চাই, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মন-মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে।

একে অপরের প্রতি সহনশীল, সহানুভূতিশীল হতে হবে। দিনরাত একে অপরের সমালোচনা করে সময় নষ্ট না করে আত্মসমালোচনা করলে নিজেরা

যেমন উপকৃত হবেন, ঠিক একইভাবে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। সুতরাং আর সময় নষ্ট না করে এখনই সাবধান হওয়া প্রয়োজন।

অন্যথায় জনগণই কিন্তু ঘুরে দাঁড়াবে। তাছাড়া প্রকৃতির প্রতিশোধ বলেও একটা কথা আছে। রাজনীতির নামে দিনরাত আমরা অপকর্ম করব আর প্রকৃতি কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করবে না, তেমনটি কিন্তু নয়।

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আজ আমাদের দেশের সংবাদের জন্য বিদেশি সংবাদমাধ্যমের দিকে চেয়ে থাকতে হবে কেন, তাদের সংবাদকে বিশ্বাস করতে হবে কেন,

সেসব সংবাদকে গুরুত্ব দিয়ে তার পেছনে সময় ব্যয়, কর্মক্ষমতা ক্ষয় করতে হবে কেন, সে বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। আমাদের তো মনে হয়, দেশীয় সংবাদপত্র, দেশীয় সংবাদমাধ্যমকে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলেই বিদেশি সংবাদমাধ্যম সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের তার পেছনে ছুটতে হচ্ছে।

সংবাদপত্র, সংবাদমাধ্যম, যারা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে, সেসব দিকে দৃষ্টি দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিদেশি সংবাদমাধ্যমের পেছনে দৌড়াতে হবে বলে মনে হয় না।

আর দেশের সংবাদপত্র, সংবাদমাধ্যম কী লিখল, কী বলল, সে বিষয়ে গুরুত্ব না দিলে বিদেশি সংবাদমাধ্যম সে সুযোগ গ্রহণ করবেই।

অতীতে আমাদের দেশের সংবাদপত্র, সংবাদমাধ্যমে কানাডার বেগমপাড়া, মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমসংক্রান্ত অনেক খবর, অনেক তথ্য প্রকাশ করা হলেও সে সম্পর্কে বিশেষ কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কি না সে সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

কারণ অতীতের সেসব সংবাদকে গুরুত্ব দিলে ব্যাংক লুটেরা চক্রসহ বিদেশে অর্থ পাচারকারীরা এতটা সক্রিয় থেকে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করতে পারত না।

আর একাত্তর থেকে একুশ পর্যন্ত এ পঞ্চাশ বছরে রাজনীতির নামে একটি লুটেরা চক্র অপকর্ম চালাতে পারত না। এতদিনে রাজনীতি ভালো মানুষের হাতে চলে আসত।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

May 2026
F S S M T W T
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031