গ্রেফতার এড়াতে পাপিয়ার গডফাদার-মাদাররা আত্মগোপনে
গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা নরসিংদী যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত এই নেত্রী পাপিয়া প্রতিদিনই স্পর্শকাতর বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। পাশাপাশি তার স্বামী সুমন চৌধুরীর সঙ্গেও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সুসম্পর্ক থাকার তথ্য মিলেছে। এমনকি নেতাদের সঙ্গে তার ছবিও সংগ্রহ করা হয়েছে।
এমতাবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউর গডফাদার-মাদাররা। গ্রেপ্তার এড়াতে তারা চলে গেছেন আত্মগোপনে। এরই মধ্যে তাদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। দুদিন আগে দুই গডফাদারকে ধরতে ঢাকা ও নরসিংদীতে অভিযানও চালিয়েছে একটি সংস্থা। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা শনিবার এসব তথ্য জানিয়েছেন।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে পাপিয়াসহ চারজন র্যাবের হাতে গ্রেফতার হন। অন্যরা হলেন পাপিয়ার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন, সাব্বির খন্দকার (২৯) ও শেখ তায়্যিবা (২২)। এই সময় তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট, জাল টাকা ও বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে র্যাব। বিমানবন্দর ও শেরেবাংলানগর থানায় করা তিন মামলায় ১৫ দিনের রিমান্ডে আছেন পাপিয়া দম্পতি।
র্যাব ও পুলিশের দুই কর্মকর্তা বলেন, পাপিয়া দম্পতির গডফাদার ও মাদারদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত। তাদের ধরার ব্যাপারেও ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পাওয়া গেছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদেও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন পাপিয়া। তারা আগ থেকেই উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন। পাপিয়া নিজের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য সবার চাহিদা পূরণ করেছেন। আর এভাবেই বড় বড় নেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের বশে আনার জন্য ‘এস্কট সার্ভিস’ শুরু করেন তিনি।
জানা গেছে, নরসিংদী যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত এই নেত্রীর সঙ্গে মেসেঞ্জারে অনেক প্রভাবশালীর যোগাযোগ ছিল। তাদের অনেকের নাম দেখে তদন্তকারীদের পিলে চমকে গেছে। বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ওইসব প্রভাবশালীর ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দিয়েছেন। তদন্ত শেষে তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। হঠাৎ পাপিয়াকে গ্রেফতার করেনি র্যাব। তার বিষয়ে র্যাবের গোয়েন্দারা তিন মাস ধরে তদন্ত করে আসছিলেন। তার অপকর্মের চারটি নথি তৈরি করেন তারা। তদন্তকালীন গ্রেফতার না হলেও নজরদারিতে ছিলেন তিনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিগন্যাল পাওয়ার পরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (উত্তর) মো. মশিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাপিয়ার বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত আছে।’
র্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেন, ‘পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো আমরা এখনো তদন্ত করছি।’ তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেফতারের পর পাপিয়াকে র্যাব-১ এর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এসময় তিনি অনেককে ফোন করলেও কেউ সাড়া দেননি। এরপর তিনি চুপসে যান। র্যাব পাপিয়ার তিনটি আইফোন জব্দ করে। একটিতে ২ হাজার নম্বর সেইভ ছিল। সেখানে তার গডফাদারদের নম্বর পাওয়া গেছে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে তাদের নামও প্রকাশ করেন পাপিয়া। তাদের মধ্যে একাধিক মন্ত্রী, এমপি, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে সমীহ করে চলতেন।
এ প্রসঙ্গে র্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, গডফাদারের কারণে পাপিয়া এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে, দিনের পর দিন পাঁচ তারকা হোটেলে অপকর্ম চালিয়ে গেলেও কেউ কিছু বলার সাহস পায়নি। গডফাদাররা তার অপকর্মে সায় দিয়েছিলেন। তাদের কারণেই নরসিংদীর একটি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা পাপিয়া কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। হয়ে ওঠেন অঘোষিত এক ক্ষমতাধর নারী। যার ধমকে চুপসে যেতেন সমাজের অনেক প্রভাবশালীও।
তিনি আরও বলেন, পাপিয়া থাইল্যান্ডে যাওয়ার আগে তার মোবাইল ফোন থেকে মেসেঞ্জারের গুরুত্বপূর্ণ চ্যাট হিস্ট্রি বা ভিডিও ডিলিট করেছেন কি-না তা নিশ্চিত হতে সিআইডি ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষাও করেছে। শিগগিরই ওই প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব ছবি প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর ব্যাপারেও তদন্ত চলছে।
