ব্রেকিং নিউজঃ

সুলতান রাজিয়া: দিল্লীর প্রথম ও শেষ নারী শাসক

দিল্লি সালতানাতের প্রথম মুসলিম মহিলা শাসক হিসেবে পরিচিত রাজিয়া সুলতানা ১২৩৬ সালের ১০ নভেম্বর জালালাত-উদ-দীন রাজিয়া নামে দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন।

সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর তাকে রাজিয়া সুলতানার পরিবর্তে রাজিয়া সুলতান বলে সম্বোধন করার আদেশ জারি করেন। সুলতান অর্থ সম্রাট বা শাসক।

মুসলিম বিশ্বে শাসকদের সুলতান বলে সম্বোধন করা হতো। সুলতানের স্ত্রীবাচক শব্দ হচ্ছে সুলতানা, যার অর্থ রানী।

সুলতানের স্ত্রী কিংবা সঙ্গীদের সম্মানসূচক সম্বোধন হিসেবে সুলতানা ব্যবহার করা হতো রাজিয়া কোনো শাসকের অধীনস্থ ছিলেন না কিংবা কোনো পুতুল সম্রাটের পেছনে থেকেও

রাজ্য শাসন করেননি। রাজিয়ার আগে অনেক নারী আড়ালে থেকে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেছেন। কিন্তু তিনি সরাসরি দিল্লীর সিংহাসনে বসে ভারত বর্ষ শাসন করেন।

তাই তাকে উপমহাদেশের প্রথম নারী শাসক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি রাজিয়া সুলতান, ভারতবর্ষের প্রথম ও শেষ নারী শাসক।

বংশানুক্রমে রাজিয়া ছিলেন এক ক্রীতদাসের উত্তরসূরি। সুলতান শাসনের প্রতিষ্ঠাতা কুতুব-উদ-দীন আইবেক প্রথম জীবনে একজন ক্রীতদাস ছিলেন।

রাজিয়া সুলতানের পিতা ইলতুতমিশ ছিলেন কুতুব-উদ-দীনের অধীনস্থ একজন ক্রীতদাস। ইলতুতমিশ সুলতানের আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হন এবং প্রাদেশিক গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন।

পরবর্তীতে কুতুব-উদ-দীন আইবেক তার প্রাণপ্রিয় কন্যা কুতুব বেগমের সাথে ইলতুতমিশের বিয়ে দেন।

১২১০ সালে সুলতান কুতুব-উদ-দীন আইবেক চৌগান (পোলো খেলার মতো একটি খেলা) খেলার সময় দুর্ঘটনায় মারা যান। তার মৃত্যুর পর পুত্র আরাম বক্স দিল্লীর সিংহাসনে বসেন।

কিন্তু শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন অযোগ্য। ইলতুতমিশ তাকে সরিয়ে দিল্লীর শাসনভার গ্রহণ করেন।

২৫ বছর সফলতার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করার পর ১২৩৬ সালে ইলতুতমিশ মৃত্যু বরণ করেন।

১২২৯ সালে বাংলার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ইলতুতমিশের সুযোগ্য পুত্র নাসির-উদ-দীন মাহমুদ মারা যান। ইলতুতমিশের অন্য পুত্রদের তুলনায় রাজিয়া ছিল

সবচেয়ে যোগ্য। ১২২৯ সালে নাসির-উদ-দীন মাহমুদের মৃত্যুর পর ইলতুতমিশ উত্তরাধিকার হিসেবে রাজিয়াকে মনোনীত করেন।

কিন্তু রাজসভার নেতাদের বিরোধিতায় ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর রাজিয়ার পরিবর্তে তার ভাই রোকন উদ্দিন ফিরোজ সিংহাসনে বসেন।

রোকন উদ্দিন ফিরোজ ছিলেন মদ্যপ ও দুশ্চরিত্র। তিনি শাসনভার তার মায়ের হাতে তুলে দিয়ে নেশায় ডুবে থাকতেন।

ফলে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তাকে এবং তার মাকে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুর পর রাজিয়া দিল্লীর সালতানাতের প্রথম নারী শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

১২০৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন ইতিহাস বদলে দেওয়া এই নারী। বড় হওয়ার পর অন্য ভাইদের সাথে অস্ত্রচালনা শিখতে শুরু করেন।

রাজ্য পরিচালনা সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করেন তিনি। এই গুণগুলো তাকে ভবিষ্যতের কোনো সম্রাটের যোগ্য স্ত্রী রূপে গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল।

কিন্তু কেউ কি জানতেন যে রাজিয়া নিজেই সুলতানী আমলের একজন যোগ্য শাসক হয়ে উঠবেন? রাজিয়া হারেমের অন্য মেয়েদের সাথে মেশার সুযোগ খুব কম পেয়েছেন।

যারা গৃহস্থালী কাজ কর্মে ব্যস্ত থাকতো। রাজিয়াকে নিয়ম কানুনের ব্যাপারে কখনোই জোর করা হয়নি। তার পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল নিজের মতো ভাবার; যা তাকে তখনকার মেয়েদের মতো অন্তর্মুখী হতে বাধা দিয়েছে।

তিনি নির্দ্বিধায় তার পিতার রাজকার্যে অংশগ্রহণ করেছেন। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও অন্যান্য সমর নায়কের মতোই হাতির পিঠে চড়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

রাজিয়ার আমলে সুলতান আমলের অন্য শাসকদের তুলনায় শিল্প-সংস্কৃতির দিক থেকে সবচেয়ে উৎকর্ষ সাধিত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, শত্রুর মোকাবেলা করেছেন, মোকাবেলা করে জিতেছেন। মেয়ে হয়ে জন্মানোর ব্যাপারটি কখনোই তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

দিল্লীর সেরা সুলতানদের সাথে কাধে কাধে মিলিয়ে শাসন করেছেন।

তার সময়ে প্রচুর বিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র, পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি শিক্ষালয়গুলোতে প্রথম কোরআন শিক্ষার প্রচলন করেন।

এছাড়াও জনপ্রিয় প্রাচীন দার্শনিকদের কাজ, মোহাম্মদের ঐতিহ্য ও বিজ্ঞান দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেন।

রাজিয়া গুণী মানুষের কদর করতে জানতেন।

রাজিয়ার ক্ষমতায় আরোহণ অনেকের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাড়ায়। অনেকেই আবার নারী শাসন মেনে নেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন।

তাই প্রথম দিন থেকেই রাজিয়াকে ষড়যন্ত্রের স্বীকার হতে হয়। সব ধরনের ষড়যন্ত্র রাজিয়া শক্ত হাতে দমন করেছেন।

কিন্তু ভালবাসা ভারতবর্ষের এই লৌহমানবীর পতনের কারণ হয়ে দাড়ায়।

রাষ্ট্র চালনার কৌশল হিসেবেরাজিয়া গুপ্তচর দল গড়ে তোলেন ক্রীতদাসদের নিয়ে।

ক্রীতদাসদের একজন ছিলেন আবিসিনিয়ান দাস জামাল উদ্দিন ইয়াকুত।

জামাল উদ্দিনের সাথে রাজিয়া প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে এমন গুজব ছড়ায় ষড়যন্ত্রকারীরা। উদ্দেশ্য রাজিয়ার চরিত্র হনন।

এই গুজবে ঈর্ষান্বিত হন ভাটিন্দার গভর্নর ইখতিয়ার উদ্দিন আলতুনিয়া। কথিত আছে, আলতুনিয়া ছিল রাজিয়ার ছেলেবেলার খেলার সাথী।

রাজিয়া-জামালুদ্দিনের এই গুজবে আলতুনিয়া প্রচণ্ড ক্ষেপে যান এবং রাজিয়ার ভাই মিজানুদ্দিন বাহরাম শাহ এর সাথে মিলে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

যুদ্ধে রাজিয়া পরাজিত ও বন্দী হন। কথিত আছে, এই যুদ্ধে জামাল উদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন।

রাজিয়ার পরাজয়ের পর মিজানুদ্দিন বাহরাম বসেন। বন্দী রাজিয়াকে আলতুনিয়া বিয়ের প্রস্তাব দেন। ক্ষমতা এবং জীবন বাঁচানোর জন্য রাজিয়া আলতুনিয়াকে বিয়ে করতে রাজি হন।

১২৪০ সালে আলতুনিয়াকে বিয়ে করে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করার উদ্দেশ্যে দিল্লীর পথে যাত্রা করে রাজিয়া-আলতুনিয়া।

কিন্তু পথে ভাই মিজানুদ্দিন বাহরাম শাহ এর পাঠানো সৈন্যের কাছে বন্দি ও নিহত হন মাত্র ৩৫ বছর বয়সে।

বলা হয়ে থাকে, প্রত্যেক সফল পুরুষের পেছনে থাকে একজন নারীর অবদান।

তেমনি সফল নারীর পেছনেও থাকে কোনো না কোনো পুরুষের হাত। জওহরলাল নেহেরু তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,

এভাবেই তিনি তার মেয়েকে প্রস্তুত করেছিলেন ভবিষ্যতের ইন্দিরা

গান্ধী হয়ে উঠতে। ইলতুতমিশ যেমনটি করেছিলেন কয়েকশত বছর আগে উপমহাদেশের প্রথম নারী নেতৃত্ব কাচিয়া সুলতানা ওঠার ক্ষেত্রে। যুগে-যুগে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে।

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

October 2026
F S S M T W T
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031