আফগানিস্তানে আটকা ৩০ জনকে দেশে ফেরাতে তৎপরতা
আফগানিস্তানে আটকে পড়া ৩০ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে নানামুখী তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
এসব বাংলাদেশির বেশির ভাগ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, আফগানিস্তান সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প, বেসরকারি কোম্পানি ও বাংলাদেশি এনজিও ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালে কর্মরত ছিলেন।
এছাড়া তাবলিগ জামাতে গিয়েও কয়েকজন আটকে পড়েছেন। আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানের পর অন্য অনেক দেশের নাগরিকদের মতো বাংলাদেশিরাও বিপাকে পড়েছেন।
উজবেকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আফগানিস্তানের বিষয় দেখাশোনা করেন।
আফগানিস্তানে দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে রাষ্ট্রদূত হিসাবে কেউ সেখানে যেতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
এ কারণে সেখানে দূতাবাস খোলা যাচ্ছে না। জানতে চাইলে তাশখন্দ থেকে টেলিফোনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জাহাঙ্গীর আলম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আফগানিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের সহায়তার জন্য আমরা একটি হটলাইন চালু করেছি।
এখন পর্যন্ত ৩০ বাংলাদেশির খোঁজ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন আফগানিস্তান ছেড়েছেন। অন্যদেরও নিরাপদে ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’
এদিকে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমাদের কর্মীরা নিরাপদ আছেন। কাবুল থেকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায়, পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইটের সময়সূচিতে ব্যাঘাত ঘটে।
তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
’ ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে দেশটিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কমিউনিটির উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত সেবা দিয়ে আসছে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল। দেশটির দশটি প্রদেশে ব্র্যাকের কর্মীরা কাজ করেছেন।
তাশখন্দে বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, দুই বাংলাদেশি বরিশালের ফারুক হোসেন ও কুমিল্লার মহিউদ্দিন কাবুলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে কাজ করতেন।
তারা আমেরিকার সামরিক বিমানে কাবুল থেকে দোহায় চলে গেছেন। তারা আজ (মঙ্গলবার) ঢাকায় পৌঁছবেন। ব্র্যাকের ছয়জন কর্মী আটকে পড়েছিলেন।
তাদের মধ্যে তিনজন আমেরিকান ফ্লাইটে দোহায় পৌঁছেছেন।
এদিকে ঢাকার করিম শিকদার, রংপুরের আসাদুজ্জামান ও রকিবুল হক মৃধাকে জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় কাজাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জার্মানির ফিচনার কোম্পানিতে কর্মরত বাংলাদেশি মো. রেজাউল করিম এবং এএন মিজানুর রহমান তাশখন্দে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানায় যে, তারা উজবেকিস্তানের ভিসা পেলে জার্মানির বিশেষ বিমানে সেখানে যেতে পারবেন।
রাষ্ট্রদূত জাহাঙ্গীর আলম জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি উজবেকিস্তানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন।
আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুততম সময়ে ট্রানজিট ভিসা দিয়েছে। এই সুযোগে বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উজবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আফগানিস্তানে আটকে পড়া যে কোনো বাংলাদেশিকে ফেরানোর জন্য ট্রানজিট ভিসা দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
উজবেকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, আফগানিস্তানে যেসব বাংলাদেশির ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে তাদের সহায়তা করার জন্য তিনি সব বিমানবন্দরে চিঠি দিয়েছেন।
যেসব বাংলাদেশির পাসপোর্টের মেয়াদ চলে গেছে তাদের জন্য ট্রাভেল পাশ ইস্যু করছে উজবেকিস্তানে বাংলাদেশ দূতাবাস।
আফগানিস্তানে আটকে পড়া যারা আর্থিক সংকটে পড়েছেন তাদের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ পাঠিয়েছেন বলেও জানান রাষ্ট্রদূত জাহাঙ্গীর আলম।
তিনি বলেন, আফগানিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশিরা ভালো আছেন। তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে।
তারা উজবেকিস্তানে আসতে পারলে বিভিন্ন ফ্লাইটে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা সহজ হবে।
যদিও আফগান শরণার্থীরা যাতে ঢুকে পড়তে না পারে সে জন্য স্থলসীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে উজবেকিস্তান।
তাশখন্দে বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, আফগান টেলিকম কোম্পানি এডব্লিউসিসিতে কর্মরত সাতজন বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার আটকা পড়েছেন।
তারা হলেন রাজিব বিন ইসলাম, কামরুজ্জামান, নজরুল ইসলাম, মাসুদ করিম, মো. ইমরান হোসেন, শেখ ফরিদ উদ্দিন, মো. মনিরুল হক।
বাংলাদেশ থেকে যাওয়া তাবলিগ জামাতের ছয়জন সদস্য পাকিস্তান সীমান্তবর্তী আফগান শহর জালালাবাদে আটকা পড়েছেন।
তবে তারা ফিরে আসার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কোনো সহায়তা চাননি।
এছাড়াও এডিবির হাইওয়ে প্রকল্পে কর্মরত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আমজাদ হোসেন কাবুলে আটকা পড়েছেন।
উত্তরাঞ্চলীয় মাজার-ই-শরিফ নগরীতে আটকে পড়েছেন ইএনএফজেড কোম্পানিতে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার আবুল খায়ের, মো. মনিরুল হক, শেখ ফরিদ উদ্দিন প্রমুখ।
ব্র্যাকের সরফরাজ সিদ্দিক, কামাল হোসেন ও ইউসুফ হোসেন আটকে পড়েছেন। কাবুলে গ্র্যান্ড টেকনোলজি অ্যান্ড রিসোর্সে কাজ করতেন সোহরাব হোসেন এবং আফগানিস্তান সরকারের নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ছিলেন মৃদুল কান্তি বিশ্বাস। তারা এখন কাবুলে আটকে আছেন।
তালেবানরা কাবুল দখলের সময় প্রথমে পুল চারকি জেল খুলে দিয়ে আইএসবাদে সবাইকে ছেড়ে দেয়। ওই কারাগারে আটক ছিলেন তিনজন বাংলাদেশি।
তাদের মধ্যে মঈন আল মেজবাহ নামের এক বাংলাদেশি কারাগার থেকে বেরিয়ে গিয়ে এক আফগান পরিবারে আশ্রয় নিয়েছেন।
তার জন্য হোয়াটসঅ্যাপে আউট পাশ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।
ওই কারাগারে ঢাকার ভাসানটেকের মেয়ে কাওসার সুলতানা এবং ফেনীর ওবায়দুল্লাহ নামের দুই বাংলাদেশি ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে তাদের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে দ্রুত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, জনসাধারণের নিরাপত্তা এবং আটকে পড়া বিদেশিদের নিরাপদে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসির স্থায়ী প্রতিনিধিদের এক জরুরি সভায় সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বিপিএম (বার) রোববার এ আহবান জানান।
বাংলাদেশের সঙ্গে আফগানিস্তানের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ ভাতৃপ্রতিম আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সেখানে স্থায়ী শান্তি প্রত্যাশা করছে। সভা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে একটি যৌথ বিবৃতি গৃহীত হয়।
