ব্রেকিং নিউজঃ

একটি ছবি ও ভাষা আন্দোলনের কিছু স্মৃতি

একটি ছবি। ছবিটি ৬৯ বছর আগের তোলা। কয়েকজন নারী, একজনের হাতে একটি কালো পতাকা। পা খালি।

মাঝখানের জনের বাদে বাকিদের সবার পোশাক সাদা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।

মাতৃভাষার দাবিতে মিছিল। স্পট কোথায় জানি না। নিঃসন্দেহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা আজকের যেখানে শহিদ মিনার, তার আশপাশে কোথাও হবে।

মাতৃভাষার দাবিতে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও যে অংশ নিয়েছিলেন, এ ছবি তার বড় প্রমাণ।

একজন বাদে, ছবির কাউকেই আমি চিনি না। ওই সময় আমার জন্মও হয়নি। আর ছবির আশপাশে যারা, তাদের সন্তানদের সঙ্গেও আমার কোনো পরিচয় নেই।

চিনিও না। মিছিলের সামনে সাদা শাড়িতে যিনি মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, শুধু তাকে আমি চিনি। তিনিও গত হয়েছেন অনেক বছর আগে, মাত্র ৪৯ বছর বয়সে।

যারা ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করেছেন, কিংবা আগামীতেও করবেন, তাদের কারো কাছে এ ছবিটি সংগ্রহে আছে কী না, কিংবা এই ছবির ‘গল্প’ তাদের জানা আছে কী না জানি না।

কিন্তু এটা একটা ঐতিহাসিক ছবি। ছোটখাটো এই মানুষটি, যিনি মিছিলের অগ্রভাগে থেকে মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন, তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী।

ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে পুলিশের হাতে তিনি গ্রেফতার বরণও করেছিলেন। এ তথ্য কোনো গবেষকরা সংরক্ষণ করেছেন কী না জানি না।

কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সময়কালে যে ক’জন ছাত্রী প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের মাঝে তিনিও ছিলেন। অনেকটা অবাক করার বিষয়, ওই সময় তিনি ছাত্রী হয়েও এসএম হলের সঙ্গে ‘এটাচ্ড’ ছিলেন।

থাকতেন টিকাটুলি এলাকার কোথাও। সম্ভবত কোনো আত্মীয়ের বাসায় থেকে পড়াশোনা করতেন। যদিও ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী নিবাস রোকেয়া হল চালু হয়নি।

চামেলি হাউজ নামে ছোট্ট একটি ছাত্রী নিবাস চালু হয়েছিল ১৯৫৬ সালে (১৯৬৪ সালে রোকেয়া হল প্রতিষ্ঠিত হয়)। সম্ভবত এ কারণেই তিনি এসএম হলের সঙ্গে ‘এটাচ্ড’ ছিলেন।

যখন রোকেয়া হল প্রতিষ্ঠিত হয়, ততদিন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাট চুকিয়েছেন। ওই সময় মেয়েদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা সহজ ছিল না। মফস্বলের একটি ছোট্ট মহকুমা (এখন জেলা) পিরোজপুর থেকে ঢাকায় এসে তৎকালীন বক্সিবাজারে অবস্থিত ইডেন মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন।

এ জন্যই টিকাটুলি এলাকায় থাকতেন, আর সেখান থেকে যেতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার খুব কাছের বন্ধুদের মাঝে ছিলেন অধ্যাপক সুফিয়া খাতুন (প্রথম মহিলা জাতীয় অধ্যাপক, প্রয়াত সৈয়দ ব্যারিস্টার ইসতিয়াক আহমদের স্ত্রী ও বিচারপতি রিফাত আহমদের মা), অধ্যাপক শরীফা খাতুন (একুশে পদকপ্রাপ্ত), অধ্যাপক হালিমা খাতুন, প্রয়াত অ্যাডভোকেট গাজীউল হক (ভাষা সৈনিক) প্রমুখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই তিনি প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি কোনো পদ-পদবির জন্য লবিং করেননি। আইন পেশায় নিযুক্ত হয়েছিলেন।

তিনি ছিলেন প্রথম মহিলা অ্যাডভোকেট। পরবর্তীতে তিনি নোটারি পাবলিকের দায়িত্বও পালন করেছেন। কাজ করেছেন ব্যারিস্টার ইসতিয়াক আহমদ, ও ব্যারিস্টার রফিকুল হকের জুনিয়র হিসাবে

প্রগতিশীল রাজনীতি করলেও, তিনি রাষ্ট্রের কাছ থেকে কখনও কোনো রাজনৈতিক সুবিধা নেননি। ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা নিয়েও সেভাবে আলোচনা হয়নি।

তিনি নিজেও চাননি। বরাবরই পর্দার অন্তরালের মানুষ ছিলেন তিনি। ছোটখোট এ মানুষটি যে কত সাহসী ছিলেন, তার বড় প্রমাণ তিনি জেলগেটে বিয়ে করেছিলেন তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের আরেক নেতা আনোয়ার জাহিদকে।

প্রগতিশীল রাজনীতি করার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবার সঙ্গেই তার পরিচয় ছিল।

তার পুরনো পল্টনের বাসায় আমি নিজে অনেকদিন প্রয়াত তাজউদ্দীন আহমদকে দেখেছি গাজীউল হককে দেখেছি। তাজউদ্দীনের মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার পরও তিনি আসতেন। বঙ্গবন্ধুও তাকে চিনতেন।

যতদূর মনে পড়ে শুনেছি বঙ্গবন্ধু তাকে তাজউদ্দীন আহমদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া ও মহিলাদের সংরক্ষিত আসন থেকে তাকে সংসদ সদস্য হিসাবে মনোনয়ন দিতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু তিনি রাজনীতিতে জড়িত হতে চাননি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর প্রয়াত মসিউর রহমান (যাদু মিয়া) তাকে রাজনীতিতে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। তখনও তিনি রাজি হননি।

পল্টনের বাসায় ‘যাদু চাচা’ই (আমি তাকে এ নামেই ডাকতাম) লন্ডনে তার ছেলে স্বপন ভাইকে আমার জন্য একটি চিঠি দিয়েছিলেন, যাতে করে লন্ডনে আমার জন্য একটি থাকার ব্যবস্থা তিনি করে দেন।

চীনের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরপরই যে বেসরকারি একটি প্রতিনিধি দল চীনে গিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তার অন্যতম সদস্য।

চীনের ‘বন্ধু’ ছিলেন তিনি। যে কারণে তার মৃত্যুর পর চীনা রাষ্ট্রদূত তার কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে সুদূর ডুমরিতলা (পিরোজপুর) ছুটে গিয়েছিলেন।

লোভ, পদ-পদবি তাকে কখনো আকৃষ্ট করেনি। তিনি চাইলে অনেক কিছু করতে পারতেন। মন্ত্রী, এমপি, অনেক কিছু তিনি হতে পারতেন।

অনেকটা নিভৃতে থেকেছেন। আজ যখন দেখি রাজনীতিবিদদের ঢাকা শহরে বাড়ি, ফ্লাট, গাড়ি, তখন ভাবতে অবাক লাগে রাজনীতির শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, তিনি এর কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি।

এই ভাষার মাসে এ মানুষটির ভাষা আন্দোলনে তার অবদানের কথা স্মরণ করছি। ছবিটি ঐতিহাসিক, এর অনেক মূল্য।

যারা ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করেন, তারা তার সম্পর্কে আরও জানুন, জনগণকে জানান, এটা আমার প্রত্যাশা।

রাষ্ট্র তার অবদানকে স্বীকৃতি দিক, এটাও আমার কামনা। তিনি অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার লাইলী।

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

May 2026
F S S M T W T
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031