স্বয়ংসম্পূর্ণতার স্বপ্ন শেষ?
গৃহিণীর মুখে পেঁয়াজ কেনার তাগিদে এখনো অনেকে আঁতকে ওঠেন। তবে পরিস্থিতি এখন আর তেমন নেই। আপাতত পেঁয়াজের আতঙ্ক শেষ। দেশি পেঁয়াজ বাজারে এখন আহরহ মিলছে। তাই দাম নেমেছে কেজিপ্রতি ৪০-এ।
এর মধ্যে কানে আসছে আজ নাকি ভারত থেকে পেঁয়াজ আসছে। কিন্তু কেন? দাম স্থিতিশীল থাকলে প্রয়োজনটা কি? সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এ পেঁয়াজ তো বাজারে ঢোকার পরেই ডুবিয়ে দেবে, ভাসিয়ে দেবে। এতে মরবে দেশের প্রান্তিক কৃষক। যাদের পেঁয়াজ সংকটে পড়ে বেশি বেশি পেঁয়াজ আবাদ করতে এক প্রকার বাধ্য করা হয়েছিল।
ওই সময় বারবার কৃষককে সুরক্ষা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। এও বলা হয়েছিল, সরকার পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চায়, এ জন্য বেশি বেশি পেঁয়াজ চাষ করুন। কিন্তু যখন চাষিরা পেঁয়াজ ফলিয়ে বাজারে এনেছেন তখন আমদানি নিয়ন্ত্রণের বদলে বাজার উন্মুক্ত করছে সরকারই।
সংশ্লিষ্টরা এও বলছেন, সেসব এলে পেঁয়াজে স্বনির্ভর হতে পারবে না বাংলাদেশ। বরং স্বনির্ভর হওয়া দূরে থাক, কৃষক আর পেঁয়াজ চাষের কথা মুখেও আনবেন না। সারা জীবন তাকিয়ে থাকতে হবে ভারতের দিকে। সহ্য করতে হবে হিংসুটেপনা। সব বুঝে আপাতত পেঁয়াজ আমদানির বিষয় মাথা থেকে বাদ দিতে হবে। আর আমদানি যদি করতেই হয়, তাহলে সেটা আগস্টের পরে।
এর থেকেও বড় কথা, কার স্বার্থে এখন পেঁয়াজ আমদানি? পেঁয়াজ সংকট থেকে যে কৃষকরা দেশকে উতরিয়ে দিল, যার শ্রমে নিষেধাজ্ঞার পরও দাম নাগালে এলো, তাদের কথা চিন্তা না করেই ভারতের দায় কাঁধে নিচ্ছে বাংলাদেশ। কারণ ভারত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে সেই দেশে দাম কমার কারণে। সেখানকার কৃষকরা দাম কমে যাওয়ার কারণে বিক্ষোভও করেছেন।
ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে, দেশটিতে অতি উৎপাদনের কারণে এখন পেঁয়াজের দাম খুবই কম। এ ছাড়া সেখানে প্রচুর আমদানি পেঁয়াজ পচছে।
পেঁয়াজের এ নাটকের প্রধান চরিত্র কিন্তু হিংসুটে ভারত। আমাদের এই প্রতিবেশী পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল বলেই পেঁয়াজের ‘ঝাঁজ’ বেড়ে ‘চোটপাটে’ রূপান্তরিত হয়েছিল। তখন কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধও শোনেনি ওই দেশ। ভারত সফরে গিয়ে পেঁয়াজ নিয়ে শেখ হাসিনার ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশের পরও শুধু নিষেধাজ্ঞা জারির আগে চুক্তিবদ্ধ পেঁয়াজই বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ওঠেনি।
গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছিল। এরপর মহারাষ্ট্রের রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের পর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি আবার চালু করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কথাও দিয়েছিল। এমনটা জানা গিয়েছিল বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির মুখ থেকে। এরপর ২৪ অক্টোবর মহারাষ্ট্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল কিন্তু পেঁয়াজ আসেনি। এরপর বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘দুর্ভাগ্য, তারা খুলে দেয়নি।’
এমন প্রতিবেশীর জন্য দেশের কৃষকদের ঘুম হারাম হচ্ছে। কারণ ভারতীয় পেঁয়াজ আসলে দাম একেবারেই পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এবার চাষিরা অনেক জমিতে প্রচুর পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। যখন তারা আবাদ শুরু করেন, দাম অনেক চড়া ছিল। এখন যখন পেঁয়াজ উঠছে, তখন দাম কমে গেছে। লোকসান শুরু হয়েছে।
তাহলে এখন সরকার কৃষক সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে কী ভাবছে এমন প্রশ্নে বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দীন শুক্রবারও গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, আমরা আলোচনা করছি। মানুষের ক্ষতি হয়, এমন কোনো সিদ্ধান্ত আমরা নেব না।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয় কিন্তু পেঁয়াজ আমদানির ঘোরবিরোধী এখনো। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির ঘোষণার পরেই কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক প্রধানমন্ত্রীর সামনে বলেছিলেন, ‘যখন হারভেস্ট শুরু হবে তখন যেন পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করা হয়। আমরা চাষিদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পেয়েছি। (পেঁয়াজ চাষের) আওতা যথেষ্ট বেড়েছে। আশা করি অসুবিধা হবে না।’
এমন প্রতিশ্রুতির পরও কেন পেঁয়াজ আসছে এমন প্রশ্নের জন্য গতকাল কৃষিমন্ত্রীকে ফোনে পাওয়া যায়নি। এরপর কৃষি সচিব নাসিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করতে পারিনি। তবে টেকনিক্যালি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেটা হচ্ছে পেঁয়াজ আমদানির জন্য ছাড়পত্র দেব না।
তাহলে পেঁয়াজ আসাটা দীর্ঘমেয়াদ হবে না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এখন যে পেঁয়াজ আসবে সেগুলোর ছাড়পত্র আগেই নেওয়া, সংকটের সময়। নতুন ছাড়পত্র দেওয়া হবে না। পুরনো ছাড়পত্রের মেয়াদ চার মাস। সেগুলো এখন আসবে।
নাসিরুজ্জামান এও বলেন, সেসব কারা নিয়েছে? কেন তারা সংগ্রহ করে চুপচাপ বসে ছিল, সেগুলো তদন্ত হবে। কারণ ওইসব সংকট মোকাবেলায় সেসময় দেওয়া।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় ভারত থেকে আবার পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিভিন্ন স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা। মার্চ মাস থেকেই পেঁয়াজ আমদানি করতে সরকারের অনুমতি চেয়েছেন তারা। ভারতের এবার পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানিমূল্যের শর্তটিও নেই। ফলে বেশ কমদামে তারা পেঁয়াজ কিনতে পারবেন।
