হযরত মোহাম্মাদ (সা:) এর বাড়ি
প্রতিবেশীর সঙ্গে : অন্যরা যখন আরেকটু বিশ্রাম করছে, তখন আমি অল্প সময়ের জন্য বের হয়ে পড়লাম। ইচ্ছা দুয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে মেশা। জানা, নবীজি তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন?
প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ করে জানলাম, আমার নবী তাদের সঙ্গে এমন কোনো আচরণ করেন না, যাতে তারা কষ্ট পেতে পারেন। এক সাহাবি বললেন, নবীজি কীভাবে অন্যকে কষ্ট দেবেন অথচ তিনিই তো বলেছেন ‘যার অনিষ্টতা থেকে প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, সে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (মুসলিম : ২/১৬)।
আবু জর গিফারি (রা.) বলেন, আমাকে আমার নবী বলেছেন ‘হে আবু জর! যখন তুমি কোনো তরকারিতে ঝোল দেবে, তখন ঝোলের জন্য পানি একটু বেশি করে দেবে। আর তোমার প্রতিবেশীদের কাছে অন্তত এর ঝোল পৌঁছানোর দৃঢ় ইচ্ছা করবে।’ (মুসলিম : ১৬/ ১৭৭)।
আবু জর (রা.) এর কথায় বুঝলাম প্রতিবেশীর মাঝে নবীজি খাবার বিতরণ করেন। আয়েশা (রা.) থেকেও জানতে পেলাম আরেক দিনের ঘটনা।
নবীজি (সা:) একবার বকরি জবাই করলেন। তা বণ্টন করে দিলেন প্রতিবেশীর মাঝে। এমনকি নবীজির প্রথমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) এর বান্ধবীদের বাড়িতেও পাঠালেন এর গোশত।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমার (রা.) থেকে জানলাম, একবার একটি বকরি জবাই করলেন নবীজি (সা:)। নবীজি বারবার সবাইকে তাকিদ দিলেন তার প্রতিবেশী অমুক ইহুদির বাড়িতে যেন অবশ্যই গোশত পৌঁছে দেওয়া হয়।
প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ সম্পর্কে নবীজির এক বক্তব্য পেলাম আবু শুরাইহ (রা.) থেকে। তিনি বললেন, নবীজি বলেছেন ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাত বিশ্বাস করে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করে।’ (মুসলিম : ২/২০)।
নবীজি বলেছেন ‘যে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।’ (মুসলিম : ২/২০)।
নবীজির আরেকটি বাক্য ইবনে ওমর (রা.) থেকে শুনে বোঝলাম, প্রতিবেশীর প্রতি আমার রাসুল কত যত্নশীল হতে পারেন। নবীজি বলেছেন ‘জিবরাইল আমাকে বারবার প্রতিবেশী সম্পর্কে তাকিদ দিচ্ছিলেন। আমি তো ভাবনায় ছিলাম, তিনি প্রতিবেশীকে আমার উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে বসেন কি না?’ (মুসলিম : ১৬/১৭৬)।
প্রতিবেশী সম্পর্কে আরও জানলাম নবীজি (সা:) মাঝে মাঝে বের হয়ে পড়েন। খোঁজখবর নেন। রাতের বেলায়ও বের হন। তিনি কমপক্ষে আশপাশের ৪০টি বাড়ির লোকদের খবর নেওয়া তাঁর নিয়মিত দায়িত্ব মনে করেন। নবীজিই বলেছেন যদি প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে, আর সে পেট পুরে খায়, তাহলে সে প্রকৃত মোমিন হতে পারে না।
আমানতদারি : বাড়ির আঙিনায় দেখলাম এক পুঁটলি টাকা-পয়সা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক লোক। জিজ্ঞেস করলাম কী ব্যাপার! এগুলো কী করবেন? নবীকে দিতে এনেছেন? আমার প্রশ্নগুলো শুনে রাগ করল কি না বোঝলাম না। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। বিদেশি দেখে ভদ্রভাবেই বলল, এ পুঁটলি নিয়ে এসেছি আমানত রাখার জন্য। আমার বিশ্বাস এখানে থাকলে তা নষ্ট হবে না। চুরি হবে না। আর খরচও হবে না। আমার কাছে থাকলে নিজেই খরচ করে ফেলব। তাই নিয়ে এসেছি আমানত রাখার জন্য।
আমাকে অবাক করে দিল আরেক আগন্তুক। বেশভূষায় স্পষ্ট বোঝলাম ইহুদি। নবীজির বাড়ির আঙিনায় তার সঙ্গে দেখা হলো। তার আগমনের উদ্দেশ্য জানার চেষ্টা করলাম। সে বলল, গত বছর স্বর্ণের কিছু অলংকার রেখেছি আমানত হিসেবে। আজ তা নিয়ে যাচ্ছি।
মনে হলো নবীজি (সা:) বক্তব্য রেখেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি। বরং বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন কীভাবে ইসলাম পালন করতে হয়। কী গুণ থাকলে মুসলমান হওয়া যায়। তাই তো এ কথা নবীজির মুখেই মানায় ‘যার মাঝে আমানতদারি নেই, কিছু গচ্ছিত রাখলে তা যথাযথ ফিরত দিতে পারে না, সে মুসলমান হওয়ার মতো ঈমান রাখে না।’ (আহমদ : ৩/৫৯৪)।
নিজের যত্নের : জানার ইচ্ছা করেছিলাম ঘরোয়া ব্যাপারে নবীজি কীভাবে সময় দিয়েছেন। ঘরোয়া কাজের মধ্যে নিজের যত্নের ব্যাপারটিও আসে। এ ব্যাপারে জানার চেষ্টা করলাম। জানলাম, নবীজি অজু-ইস্তেনজা নিজেই করে থাকেন। এতে কারও সাহায্য নেন না। যেসব জিনিস পরিষ্কার করতে হয়, তা নিজেই করেন। নিজের হাতেই নখ কাটেন। নখ কাটার নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নেই। তবে সাধারণত হাতের নখ কাটার সময় ডান হাতের শাহাদৎ আঙুল থেকে শুরু করে মধ্যমা, তারপর তার ডানের আঙুল (অনামিকা) এরপর কনিষ্ঠা আঙুল। তারপর বাম হাতের কনিষ্ঠা, অনামিকা, এভাবে মধ্যমা হয়ে শাহাদত, বৃদ্ধাঙ্গুলি, সর্বশেষে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ কাটেন। পায়ের নখ কাটার ক্ষেত্রে ডান পায়ের কনিষ্ঠা আঙুলের নখ থেকে শুরু করে বাম দিকে আসতে থাকেন। বাম পায়ের কনিষ্ঠা আঙুলে এসে নখ কাটা শেষ করেন। নখ সপ্তাহে একবার কাটেন। ১৫ দিনেও একবার কাটেন। (উসওয়ায়ে রাসুলে আকরাম : ১০৪)।
চুল আঁচড়াতে চিরুনি ব্যবহার করেন। মাথায় তেল দেন। দাড়িতে তেল দেন। তেল দেওয়ার পর দাড়ি ও চুল আঁচড়িয়ে থাকেন। ঘুমানোর পূর্বে চুল-দাড়ি আঁচড়িয়ে নেন নিয়মিত। অনেক সময় মাথায় বেশি করে তেল দেন। তেল যেন অন্য কাপড়ে না লাগে, সেজন্য আলাদা কাপড় দিয়ে রাখেন মাথায়।
আয়নাও ব্যবহার করেন। কাঁচিও ব্যবহার করেন। আয়না ব্যবহার করার সময় নবীজি দোয়া করেন। দোয়া সাধারণত এমন হয় ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার চেহারা সুন্দর করে তৈরি করেছেন। আপনি আমার চরিত্রও সুন্দর করে দিন। আর আমার রিজিকে ব্যাপকতা দান করুন।’ (শুআবুল ঈমান : ৬/৩৬৪)।
আরবে পানির প্রচুর অভাব। প্রতিদিন গোসল করার সুযোগ হয় না। অনেকেই সপ্তাহে একবার গোসল করে। নবীজি (সা:) সময় ও সুযোগমতো গোসল করেন। বিশেষ করে জুমার দিনে গোসল করা অনেকটা নিয়মিতই চলে। গোসলের জন্য যখন পানি কম থাকে, তখন ২/৩ লিটার পানি দিয়েও গোসল করে নেন। (মুসলিম : ৪/৫)। আবার প্রয়োজনে বেশি পানিও ব্যবহার করেন। তবে কোনো অবস্থাতেই পানির অপচয় করেন না। নবীজি গোসল একাও করেন। আবার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েও করেন। শরীরের যত্নের নবীজির বিভিন্ন কার্যক্রম জানতে ভালোই সময় কেটে গেল।
