সাক্ষাৎকার: ড. আকবর আলি খান
দুর্নীতির কারণে পঙ্গু হচ্ছে অর্থনীতি
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, সাবেক অর্থ ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান বলেছেন, দুর্নীতির কারণে দেশের অর্থনীতি পঙ্গু হচ্ছে।
পঙ্গুত্বের করাল গ্রাস থেকে অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে দুর্নীতি রোধ করতে হবে।
দুর্নীতি রোধ করতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। দেশের প্রায় সব খাতেই সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে।
সুশাসন না থাকলে জবাবহিদিতা প্রতিষ্ঠা হবে না। করোনার ক্ষতি মোকাবিলা করতে বর্তমানে প্রচলিত বাজেটের কাঠামোকে ভেঙে ফেলতে হবে।
তবে মানুষ ও অর্থনীতিকে বাঁচানোর কৌশল দিতে হবে। সম্প্রতি সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেলোয়ার হুসেন
অর্থনীতিতে করোনার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় আগামী বাজেট কেমন হওয়া উচিত?
ড. আকবর আলি খান : বর্তমান প্রেক্ষাপটে করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় প্রণোদনানির্ভর বাজেট করতে হবে।
কোভিডের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে বাঁচাতে হবে, স্থবির অর্থনীতিকে চাঙা করতে হবে।
এজন্য বাজেটের প্রচলিত কাঠামো ভেঙে ফেলতে হবে। নতুন কাঠামোয় বাজেট করতে হবে।
যাতে থাকবে কোভিডের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলার কৌশল। তবে বাজেটের দর্শন ঠিক রাখতে হবে। বাজেটের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, বাজেট হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দলিল। গত বছর কেমন গেল, আগামী বছর কেমন যাবে, কী করতে চায় সরকার-এর একটি দিকনির্দেশনা থাকে।
সেগুলো থাকতে হবে। পাশাপাশি কোভিডের ক্ষতি মোকাবিলার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনাও জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে, যাতে জনগণের মনে আস্থার সঞ্চার হয়।
তারা ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস ও সুযোগ দুটিই পান। অর্থাৎ বর্তমান প্রেক্ষাপট সামনে রেখে মানুষকে বাঁচাতে হবে, মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করতে হবে।
চাঙা করতে হবে অর্থনীতিকে। এজন্য বর্তমানের বাজেটের কাঠামো যতটুকু ভাঙা দরকার তা ভাঙতে হবে।
করোনার প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আয় বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় কী?
ড. আকবর আলি খান : বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয় বাস্তবতাবিবর্জিত ধারায়। করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির।
তারপরও গত বছর উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। বছর শেষে তা আদায় হয় না। ফলে লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করতে হয়।
এতে সরকারের ব্যয় কিন্তু কমানো যায় না। ফলে সরকারকে বেশি পরিমাণে ঋণ করতে হয়। এতে সরকারের ব্যয় বাড়ে।
মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণে বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো গঠন করা দরকার, যার ভিত্তিতে বাস্তবতার আলোকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হবে।
অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। এতে বাজেটে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এ বিশৃঙ্খলা সহজে শৃঙ্খলায় আনা যাবে না।
আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, সরকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে। এটি আদায় হচ্ছে না। কর্মকর্তাদের ওপর চাপ বাড়ে। দুর্নীতি হয়। তারপর সংশোধন করছে। এটি কাম্য নয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?
ড. আকবর আলি খান : দেশের অবকাঠামোগত খাতে আরও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দেশে উচ্চাভিলাষী বেশকিছু প্রকল্প নির্মিত হচ্ছে। যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে সেগুলোয় বেশি খরচ পড়ছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে বেশি খরচের কারণে অর্থনীতিতে সেবা পেতে অনেক বেশি ব্যয় হবে।
ফলে সেগুলো অর্থনীতির জন্য সুখকর কিছু বয়ে আনবে না। বরং অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে। কারণ এত ব্যয়বহুল প্রকল্প থেকে সেবা নিয়ে অর্থনীতিকে প্রতিযোগিতামূলক করা খুব কঠিন হবে এ সময়ে।
একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। তখন সেসব প্রকল্প সরকারের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
দেশে দুটি অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগ দরকার : এক. সড়ক যোগাযোগ, দুই. বিদ্যুৎ।
এ দুটি খাতে বড় বিনিয়োগ করলে এবং খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভবিষ্যতে ভালো সুফল পাওয়া যাবে।
করোনার কারণে দেশের অর্থনীতিতে যেসব চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে সেগুলো মোকাবিলায় করণীয় কী?
ড. আকবর আলি খান : করোনার কারণে এখন স্বাস্থ্যবিষয়ক চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বড়। শিক্ষা খাতও চ্যালেঞ্জের মুখে।
কারণ এক বছরের বেশি সময় ধরে এ খাতে স্থবিরতা চলছে। এটি মোকাবিলায় বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
করোনার এ ক্ষতি মোকাবিলায় দুটি জিনিস দরকার : এক. দ্রুত ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত, দুই. সুশাসন নিশ্চিত করা।
আমাদের দুর্ভাগ্য-স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সুশাসনের বড় অভাব রয়েছে। অন্যান্য খাতেও সুশাসনের অভাব রয়েছে।
সুশাসনের অভাবে অর্থনৈতিকভাবে অনেক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। সব মিলে সুশাসনের অভাবে সব খাতেই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
ড. আকবর আলি খান : সুশাসনের জন্য সরকারকে অনেক কিছু করতে হবে। এগুলো এক বা দুই বছরে হবে না।
কমপক্ষে আগামী ১০ বছর সুশাসনের জন্য কাজ করতে হবে। সব খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসনের অভাবে সরকারের যেমন ইমেজ নষ্ট হচ্ছে, তেমনই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আপনার লেখা ‘বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’ শীর্ষক বইয়ে আপনি লিখেছেন ‘বাজেটে বরাদ্দ বেশি হলে রাজনীতিবিদরা তাদের মক্কেলদের বেশি খুশি করতে পারে।’ এখানে মক্কেল বলতে কাদের বুঝিয়েছেন?
ড. আকবর আলি খান : রাজনীতিবিদরা নির্ভর করছে ব্যবসায়ীদের ওপর। এখানে দুই পক্ষের সম্পর্কে রয়েছে। বাজেট প্রণয়ন হচ্ছে এ দুই পক্ষের সম্পর্কের ভিত্তিতে।
এ সম্পর্কটি গণমানুষের দিকে নিয়ে যেতে হবে। তাহলে বাজেটের সুফল আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশই কালো পর্দায় আবৃত। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?
ড. আকবর আলি খান : সোজা কথায় কালো টাকাসাদা করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। বরং শাস্তি দিতে হবে। তাহলে কালোটাকার জন্ম হবে না।
যতদিন কালাটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হবে, ততদিন কালোটাকার জন্ম হবে। কালোটাকাকে নিরুৎসাহিত করতে সাদা করার সুযোগও বন্ধ করতে হবে।
বাজেটের পরিসংখ্যান নিয়ে আপনার কিছু বলার আছে?
ড. আকবর আলি খান : বাজেটে সংখ্যার ভারিত্ব থাকে, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। সাধারণ মানুষ বোঝে এমনভাবে বাজেট তৈরি করতে হবে।
সংখ্যা দিয়ে বাজেট বোঝানো যাবে না। একটি দর্শন থাকতে হবে। বর্তমানে বাজেট সংখ্যা দ্বারা নির্মিত।
যেসব সংখ্যা দেওয়া হয়, সেগুলো বাংলাদেশ পরিসংখ্যার ব্যুরো (বিবিএস) থেকে দেওয়া হয়। গবেষকরা অভিযোগ করেন, বিবিএস যেসব তথ্য দিচ্ছে তা সঠিক নয়।
অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। অনেকটা সরকারের চাহিদামতো তথ্য তৈরি করে তারা সরবরাহ করছে। মনে রাখতে হবে, তথ্য তৈরি করা যায় না।
তৈরি করলে সেটি বিশ্বাসযোগ্য হয় না। তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশন গঠন করতে হবে।
তারা স্বাধীনভাবে মাঠ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো সরবরাহ করবে। সময়ের প্রয়োজনে এটি এখন অপরিহার্য।
যুগান্তর : আপনি তো এবিআরের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। এদেশে রাজস্ব আদায়ে চ্যালেঞ্জেগুলো কী কী? সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা যায়?
ড. আকবর আলি খান : আমাদের সময়ে রাজস্ব আদায়ে একটা শৃঙ্খলা ছিল। এখন নেই। কোন খাতে কত রাজস্ব আয় হবে তার একটি হিসাব করে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতো।
এখন সেটি করা হয় না। এখন একটি ধারণা দেওয়া হয়। সেই ধারণা অনুযায়ী কাজ করা সম্ভব হয় না। এছাড়া কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বাজস্ব আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু আদায় হয় না। তখন দুর্নীতি বাড়ে। কীভাবে অর্থ আসবে সেটি ঠিক করা হয় না। অনুমাননির্ভর হিসাব করা হয়। যে কারণে রাজস্ব আদায় ও লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে মিল থাকছে না।
আপনার ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ বইয়ে আপনি একটি অধ্যায় লিখেছেন ‘শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি’। এখানে শুয়োরের বাচ্চা বলতে কাদের বুঝিয়েছেন?
ড. আকবর আলি খান : দেশি-বিদেশি দুই খাতকেই বোঝানো হয়েছে। বিশেষ করে যারা দুর্নীতি করে। দুর্নীতির মাধ্যমে তারা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
দুর্নীতির মাধ্যমে একটি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার কারণেই দুর্নীতিবাজদের শুয়োরের বাচ্চার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
দুর্নীতি রোধ করা না গেলে অর্থনীতিকে পঙ্গুত্বের হাত থেকে বাঁচানো যাবে না। আর দুর্নীতি রোধ করতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতিতে আমাদের ক্ষতি বেশি হচ্ছে। বিদেশিরা বেশি টাকা খরচ করে প্রকল্প তৈরি করে সুফল পাচ্ছে। আমরা কম টাকা খরচ করে কোনো সুফলই পাচ্ছি না।
সরকারের অপচয় রোধ সম্পর্কে আপনি অনেক লিখেছেন। কীভাবে রোধ করা যায়?
ড. আকবর আলি খান : অপচয় কিছুটা থাকবে। এটাকে একেবারে রোধ করা যাবে না। কিন্তু সেটি হ্রাস করতে হবে।
আপনি দেশের দুই খ্যাতিমান প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও শাহ এএমএস কিবরিয়ার সঙ্গে কাজ করে বাজেট প্রণয়ন করেছেন। সে সময়ের অম্লমধুর কিছু স্মৃতিচারণ করবেন কি?
ড. আকবর আলি খান : দুজনকেই আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
আপনি যখন বাজেট বক্তৃতা লেখা শুরু করেন, তখন প্রায়ই দেখা যেত রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা বিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি ব্যবহার করছেন। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?
ড. আকবর আলি খান : এটি নির্ভর করে অর্থমন্ত্রীর মনোভাব ও বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িতদের সক্ষমতার ওপর।
সুএ যুগান্তর
