• আজঃ শনিবার, ১০ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৩শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং
  • English
ব্রেকিং নিউজঃ

আসুন সর্বোচ্চ ত্যাগে স্বাধীনতা সমুন্নত রাখি: প্রধানমন্ত্রী

জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ। এ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে তিনি জাতির উদ্দেশে বলেন, ‘জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের এ মাহেন্দ্রক্ষণে আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি- প্রয়োজনে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে হলেও ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ নির্যাতিত মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখব। জাতির পিতা যে অসাম্প্র০দায়িক, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কার্যকরী ভূমিকা রাখব, ইনশাআল্লাহ।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালির মুক্তি-সংগ্রামের ইতিহাসে এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের এ দিনে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। এ মহান নেতার অনুপস্থিতিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত জয়ের উল্লাস-উদ্দীপনায় অপূর্ণতা ছিল যেমন স্পষ্ট, তেমনই যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশ পুনর্গঠনে তার নেতৃত্ব গ্রহণ সর্বজনীন উপলব্ধিতেও ছিল অতি প্রতীক্ষিত। তাই ১০ জানুয়ারি বাংলার মানুষ তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে অনুভব করেছিল পরিপূর্ণ বিজয়ের স্বাদ।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য দীর্ঘ ২৪ বছর সংগ্রাম করেছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম সব ক্ষেত্রেই তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, সব সময় দূরদর্শী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে দলকে সুসংগঠিত করেছেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জনগণের এ রায়কে উপেক্ষা করে, শুরু করে প্রহসন। বাংলার নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে জাতির পিতা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের এক জনসমুদ্রে ঘোষণা করেন- ‘…প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। …এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। পঁচিশে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি নিধন শুরু করে। বঙ্গবন্ধু ছাব্বিশে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

স্বাধীনতা ঘোষণা করার পরপরই পাকিস্তানি বাহিনী জাতির পিতাকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের নির্জন কারাগারে প্রেরণ করে এবং তার ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাতে থাকে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রহসনের বিচারে ফাঁসির আসামি হিসাবে মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতেও তিনি বাঙালির জয়গান গেয়েছেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণশক্তি। তার অবিচল নেতৃত্বে বাঙালি জাতি মরণপণ যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে আনে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। একই দিন সকাল ৬টা ৩৬ মিনিটে তিনি লন্ডনে অবতরণ করেন। সেখানে কমনওয়েলথ মহাসচিবের আহ্বানে বাংলাদেশের সদস্যপদ গ্রহণে তাৎক্ষণিক সম্মতি জানান, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সংবাদ সম্মেলন করেন। জাতির পিতা ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সকালে দিল্লিতে যাত্রাবিরতি দিয়ে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে বাংলার মাটিতে পদার্পণ করেন। ওইদিন রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসমুদ্রে এক ভাষণে তিনি পাকিস্তনি সামরিক জান্তার নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দেন। সেই সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা সংঘটনের দায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বিচারের মুখোমুখি করতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তার বলিষ্ঠ পদক্ষেপে ভারতীয় মিত্রবাহিনী ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। তিনি ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭২ বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে স্বাক্ষর করেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বন্ধুদেশ দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বঙ্গবন্ধুর ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্বে অতি অল্পদিনের মধ্যেই বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় এবং একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে মাত্র সাড়ে ৩ বছরেই স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী চক্র জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে এ দেশে হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি চালু করে। তারা ’৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়। মোস্তাক-জিয়াচক্র খুনিদের বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে কূটনৈতিকের চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে, রাজনৈতিকভাবেও প্রতিষ্ঠিত করে। মার্শাল ল’ জারির মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে বিকৃত করে। সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করে। বিএনপি-জামায়াত সরকার এ ধারা অব্যাহত রাখে।

২১ বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম এবং অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, একই বছর ১২ নভেম্বর ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল আইন-১৯৯৬’ সংসদে পাশ করে। এর মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের সব বাধা দূর হয়।

তিনি বলেন, আমরা ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দিন বদলের সনদ’ ঘোষণা দিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করি এবং পরপর তিনদফা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হই। আমরা জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর করেছি। ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যুদ্ধপরাধীদের বিচার করেছি। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছি, ফলে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পথ বন্ধ হয়েছে’, বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত বারো বছরে আমরা উন্নয়নের সব সূচকে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করেছি। অর্থনৈতিক অগ্রগতির মানদণ্ডে বিশ্বের প্রথম ৫টি দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছি। আমরা দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে এনেছি। মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত করেছি। এখন আমাদের মানুষের গড় আয়ু ৭২.৬ বছর। ৯৯ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধা দিচ্ছি। পদ্মা সেতুর সব স্প্যান বসানোর ফলে বিশ্বের অন্যতম খরস্রোতা নদীর দু’প্রান্ত এখন সংযুক্ত হয়েছে। রাজধানীতে মেট্রোরেল ও এক্সপ্রেসওয়ে এবং কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক করেছি। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল আজ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছি।’

ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটি ছাড়িয়েছে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর কর্মসংস্থানের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশিতে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করায় সুনীল-অর্থনীতির দ্বার এখন উন্মুক্ত। প্রথম ‘বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা’র সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে রূপকল্প-২০২১ অর্জন প্রায় শেষ। মুজিববর্ষে অঙ্গীকার করা হয়েছে কেউ গৃহহীন থাকবে না। শহরের সব সুযোগ-সুবিধা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও পৌঁছে দেয়া হবে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও মাদক নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট’ অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে ‘দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা’ প্রণয়নসহ ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ নামে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে আমরা ২০২০-২১ সময়কে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করেছি। ২৬ মার্চ ২০২১ আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করব। কিন্তু, এরই মধ্যে বৈরী কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস সারা বিশ্বে মহামারি আকারে ছড়িয়েছে।’

‘আমরা পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা সীমিত পরিসরে ডিজিটাল-মাধ্যমে চালু রেখে এ মহামারি থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে জীবনযুদ্ধে নেমেছি। আমি ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছি, ক্রান্তিকাল উত্তরণে ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ান নিয়োগ করেছি। দরিদ্র-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে ২১টি প্যাকেজের আওতায় ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছি। করোনা মহামারি পরিস্থিতিতেও আমরা ৫.২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি’ বলেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার মহানায়ক, জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষ্যে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

January 2021
FSSMTWT
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031