• আজঃ রবিবার, ১১ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং
  • English

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস

আজ মুক্তির মহানায়কের ফেরার দিন

নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে বীর বাঙালি। স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। কিন্তু অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনো পাকিস্তানের কারাগারে।

ফলে স্বাধীনতা এলেও নেতার অনুপস্থিতিতে অপূর্ণতা থেকে গিয়েছিল বিজয়ের গৌরব।

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে ১৯৭২ সালের আজকের দিনে (১০ জানুয়ারি) স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখেন মুক্তির মহানায়ক।

তার আগমনে পূর্ণতা পায় মহান স্বাধীনতা। সেই থেকে দিনটি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পালিত হয়।

বঙ্গবন্ধু নিজে তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন- ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে।

প্রতি বছর বিস্তারিত কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করে আওয়ামী লীগ ও দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন।

এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও দিবসটি উপলক্ষে নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর যুগসন্ধিক্ষণ ২০২১ সালে পরিকল্পনা ছিল আরও বড় পরিসরে আয়োজনের।

কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সব কর্মসূচিতেই পরিবর্তন আনা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটিতেও বড় আকারে জনসমাগমের মাধ্যমে কোনো কর্মসূচি পালিত হচ্ছে না।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন এবং আলোচনা সভা, দোয়া, শীতবস্ত্র বিতরণসহ নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর একটা যুগসন্ধিক্ষণ হচ্ছে ২০২১ সাল।

এই যুগসন্ধিক্ষণে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে নিরলস প্রয়াস চালাতে হবে। ২০২১ সালের মধ্যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনে সফলতার পথ ধরে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গঠনের পথে এগিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে এটাই প্রত্যাশা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি-প্রয়োজনে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে হলেও ৩০ লাখ শহীদ ও দুলাখ নির্যাতিত মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখব।

জাতির পিতা যে অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কার্যকরী ভূমিকা রাখব, ইনশাআল্লাহ।

এদিকে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে শনিবার এক ভিডিও বার্তায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র আমির হোসেন আমু বলেন, বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশ মানুষের কাছে ছিল কল্পনাতীত, স্বাধীনতার স্বাদ বাঙালির কাছে ছিল অপূর্ণ।

তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পরিপূর্ণতা পায় দেশবাসী।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য তোফায়েল আহমেদ আলাদা এক ভিডিও বার্তায় বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়ে গেছেন।

তার আরেকটি স্বপ্ন ছিল-ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ। মহান নেতার স্বপ্ন দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মহানায়কের ফেরা : ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছিলেন-‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের পূর্বপরিকল্পিত বাঙালি নিধনযজ্ঞের নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়ন শুরু করে। লাখ লাখ নিরীহ বাঙালির ওপর আক্রমণ ও গণহত্যা চালায় তারা।

এ প্রেক্ষাপটে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাসা থেকে গ্রেফতার করে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে আটকে রাখে।

মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় তিনি পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারাগারে বন্দি ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তির পরপরই তিনি বাংলাদেশে ছুটে আসতে চান।

ওই সময়ের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে তেহরান বা অন্য কোনো এয়ারলাইন্স বেছে নিতে বললে তিনি ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে আসার সিদ্ধান্ত নেন। লন্ডন পৌঁছে তিনি বিবিসিতে বিশ্ববাসীর উদ্দেশে একটি ভাষণ দেন।

তিনি যখন ভরাট কণ্ঠে তার সুস্থতার কথা জানান, ঠিক সেই মুহূর্তটিতে লাখ লাখ বাঙালি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন। তখনো যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এ সময় ব্রিটিশ বিরোধীদলীয় নেতা হ্যারাল্ড উইলসনও তাকে স্বাগত জানাতে সাক্ষাৎ করেন। তাকে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা।

লন্ডন থেকে দিল্লিতে পৌঁছান অবিস্মরণীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সমগ্র দেশবাসী তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা দেন।

এ সময় তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকার জন্য ভারতবাসী ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। এরপর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ১০ জানুয়ারি দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে তিনি পা রাখেন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে।

অধীর আগ্রহে অপেক্ষারত লাখ লাখ বাঙালি সেই মুহূর্তে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন প্রিয় নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ফিরে পেয়ে। পুরো দেশই তাকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত ছিল, তার কিছুটা চিত্র ধরা পড়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে।

জয় বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠা বিমানবন্দর যেন বাংলার আকাশ-বাতাসকেই প্রতিনিধিত্ব করছিল। পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ সেই মুহূর্তে অবিস্মরণীয় এই নেতাকে গ্রহণ করতে অংশ নিয়েছিলেন।

মহান এই নেতাকে একটু ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এক ধরনের ব্যাকুলতা কাজ করছিল। তাকে বহনকারী ট্রাকটিও সে সময় ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের গণহত্যার সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর থেকে সরাসরি চলে যান রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমবেত লাখো মানুষের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে জনতার উদ্দেশে দেওয়া প্রথম সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের জন্য দেশবাসীকে অভিনন্দন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার কাজে সবাইকে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান।

সেদিন রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন, ‘রক্ত দিয়ে হলেও আমি বাঙালি জাতির এই ভালোবাসার ঋণ শোধ করে যাব।’

রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের মাত্র তিন বছর সাত মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কুচক্রী মহলের চক্রান্তে তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বিদেশে থাকায় বেঁচে যান দুই কন্যা।

কর্মসূচি : আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে আছে আজ সকালে সাড়ে ৬টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৯টায় জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন এবং বেলা তিনটায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

এতে প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন থেকে ২৩, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের আলোচনা সভায় যোগ দেবেন।

এ ছাড়া সকাল ১১টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর যুবলীগের কার্যালয়ে এক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী হবে। ১০ জানুয়ারি সকাল ১০টায় মেরুল বাড্ডার ডিআইটি মাঠে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে শীতবন্ত্র বিতরণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করবে কৃষক লীগ।

সকাল ১১টা রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে স্বেচ্ছাসেক লীগ। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের অন্যান্য সহযোগী সংগঠনও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করবে।

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

January 2021
FSSMTWT
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031