• আজঃ শনিবার, ১০ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৩শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং
  • English

বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম লালু

বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম, যিনি লালু নামেই বেশী পরিচিত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় লালুর বয়স ছিলো মাত্র ১১ বা ১২ বছর (কতক সূত্রে আরো কম বয়স পাওয়া যায়)।

শহিদুল ইসলাম লালু ৪২৬ জন গ্যাজেট ভুক্ত বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ৪২৫ নং ব্যক্তি।
জন্ম ও পরিচয়ঃ- লালু আনুমানিক ১৯৬০ সালে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার পৌর এলাকার সুতিপলাশ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হেলাল উদ্দীন এবং মায়ের নাম সুধামণি।
লালুর মুক্তিযুদ্ধের গল্পঃ

মুক্তিযুদ্ধে যোগদানঃ স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার কাজী হুমায়ুন আশরাফ বাঙ্গাল ও আনোয়ার হোসেনের সাহায্যে স্থানীয় মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগদান করেন।

শুরুতে ছোট্ট লালু মুক্তিযোদ্ধাদের চা-পানি খাওয়ানো, টুকিটাকি হাতের কাজ, অস্ত্র পরিষ্কারের কাজ করতেন, কিন্তু সপ্তাহখানেক পর মুক্তিযোদ্ধা দলের সাথে ট্রেনিং করার জন্য সে ভারত চলে যায়।

ভারতে গিয়ে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ট্রেনিংয়ে অংশ নিয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে অস্ত্র হিসেবে স্টেনগান ও গ্রেনেড চালনার অনুমতি পান।

ট্রেনিংয়ের সময় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণকালে ব্রিগেডিয়ার সামসিং শহিদুল ইসলামের নামের সাথে লালু নামটি যুক্ত করে দেন।

পরে তিনি লালু নামেই পরিচিতি লাভ করেন। তুরা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ চলাকালে প্রতিদিন তিনি সকাল-সন্ধ্যায় হুইসেল বাজিয়ে সব মুক্তিযোদ্ধাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে পতাকা উঠাতেন ও নামাতেন।

গোপালপুর থানার গ্রেনেড হামলার ঘটনাঃ
১৯৭১ সালের ৭ অক্টোবর গভীর রাতে কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থানরত ক্যাম্পে আক্রমণ করেন।

শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ, কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল থেকে নতুন পাকিস্তানি সেনা এসে নিজেদের পাকিস্তানী ঘাঁটির শক্তি বৃদ্ধি করে।

ফলে কমান্ডার আবদুল হাকিম, হুমায়ুন, তারা ও বেনুর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ৮ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত যুদ্ধ করেও পাকিস্তানী ক্যাম্পের পতন ঘটাতে পারলেন না।

এরপর দলনেতা আবদুল হাকিম রণকৌশল পরিবর্তন করে পাকিস্তানি সেনা ঘাটি চারদিক থেকে অবরোধ করে রাখেন, এতে কিছুটা সাফল্য আসে।

পাকিস্তানি সেনারা ঘাঁটির ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এই সময় কমান্ডারের পরামর্শ মতে লালু কাজের ছেলের ছদ্মবেশে পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটিতে প্রবেশ করেন। কমান্ডারের আদেশ মোতাবেক নির্ধারিত দিনে লালু হাফপ্যান্ট পরে ক্যাম্পের সামনে যেতেই লালুর গ্রামের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে তার দেখা হয়।

সে তখন রাজাকারদের সাথে নিয়ে রাস্তা পাহারা দিচ্ছিলো।
আত্মীয়ঃ কিরে লালু এতদিন কোথায় ছিলি?
লালুঃ কোথায় আর যাব !! চারদিকে শুধু গোলাগুলি, আমার ভয় লাগে, তাই নানাবাড়ি গিয়েছিলাম।
আত্মীয়ঃ তুই আমাদের ক্যাম্পে থেকে যা, বাংকারে পাঞ্জাবি সেনাদের চা-টা খাওয়াবি, তোকে অনেক টাকা দেবো, তোকে কেও মারবেও না।

এইতো লালু সুযোগ খুজে পেলো, লালু রাজি হয়ে পাক সেনাদের ঘাটিতে প্রবেশ করে, সেখানে সেনাদের বিভিন্ন কাজ করে দিয়ে আস্থা অর্জন করে।

পরে গ্রেনেডসহ ঘাঁটিতে প্রবেশ করে সেখানে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিরাপদে ফিরে আসেন।

তার এই দুঃসাহসিক অভিযানে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীসহ ৮ জন নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হয়।

এই সফল গ্রেনেড হামলার পর শহীদুল ইসলাম লালু আরও কয়েকবার দূর থেকে সেখানে গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। এতে পাকিস্তানি সেনারা অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পরে।

পরবর্তীতে নভেম্বরের শেষ দিকে মুক্তিযোদ্ধারা আবার গোপালপুর আক্রমণ করেন। দু-তিন দিন যুদ্ধ চলে, এবার পাকিস্তানি সেনারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

এই যুদ্ধেও শহিদুল ইসলাম লালুও অংশগ্রহণ করে। গোপালপুরের যুদ্ধ ছাড়াও আরও কয়েকটি গেরিলা অপারেশনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মুক্তিযুদ্ধের পরঃ – মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কাদেরিয়া বাহিনীর সব মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা দিচ্ছিলেন, তখন বন্ধবন্ধু এই বালককে দেখে কোলে তুলে আদর করেছিলেন ও প্রশংসা করেছিলেন। এই দৃশ্য পরে ‘বাঘা বাঙালি’ ছবিতে দেখানো হয়েছিল।

চিত্রঃ লালুকে কোলে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পাশে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে লালু ফিরে আসে গ্রামে।

গ্রামে এসে একমাত্র ভাইকেও খুঁজে পায় না। শৈশবেই মা-বাবা মারা গিয়েছিলো, লালু এখন একা। মুক্তিযুদ্ধে জয় লাভ করলেও জীবন যুদ্ধে হেরে গিয়ে কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ছুটে এলো ঢাকায়।

ঢাকার এসে ঠেলাগাড়ি ঠেলা, রাজমিস্ত্রী ও সোয়ারীঘাটের কুলিগিরি, হোটেলের বাবুর্চি করে কাটিয়ে দিলেন দীর্ঘ কয়েক বছর।

লালুর বয়স তখন মাত্র ৩৭ বছর, কিন্তু দুঃখের জীবনে খেয়ে-নাখেয়ে, অর্ধ পেটে চলতে চলতে শরীরের মুমূর্ষু অবস্থা। এরমধ্যে ১৯৯৭ সালে লালু ভীষণ অসুখে পড়ে আরো খারাপ অবস্থায় পরে গেলেন।

পরে অনেক কষ্ট করে ঠিকানা জোগাড় করে ছুটে গেছে কৈশোরের ‘লিডার’ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কাছে। লালুকে দেখে বঙ্গবীর প্রথমে চিনতে পারেননি।

পরে তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন।

এরপরে মুক্তিযুদ্ধের কাগজপত্র খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল বাংলাদেশ সরকারের ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত গেজেটে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিসেনাদের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে।

লালুর নাম প্রকাশের ঘটনায় লালু যেমন খুশি হয়েছে, তেমনি সাথে সাথে পত্রিকা ভরে গেলো লালুর প্রতিবেদনে। খবর পড়ে ততকালীন প্রধানমন্ত্রী লালুকে দপ্তরে ডেকে পাঠান এবং তাকে সম্মানিত করেন। লালুর দুঃখ-দুর্দশার দিন কেটে গেলো, প্রচুর অনুদান পেলো, কিন্তু সেটা পেলো ২৬ বছর পর, যখন লালু মৃত্যুর একদম প্রান্তিক পর্যায়ে চলে এসেছে।

মৃত্যুঃ- এই মহান কিশোর বীর শহিদুল ইসলাম লালু ২০০৯ সালের ২৫ মে মৃত্যুবরণ করেন। লালুর স্ত্রী মালা তাঁর সন্তানদের নিয়ে বর্তমানে মিরপুরের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের একটি বাঁশের ঘরে বসবাস করছে।
পুরষ্কার ও সন্মাননাঃ শহিদুল ইসলাম লালু বহু পুরষ্কার ও সন্মান পেয়েছেন।

যেগুলো হলোঃ- সশস্ত্র বাহিনী দিবস ২০০০ আজীবন সংবর্ধনা ২০০৩ শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া কর্তৃক পুরস্কার ও আর্থিক অনুদান, মিশরের রাষ্ট্রদূত কর্তৃক পুরস্কার।

আমাদের এই সাহসী বীর পুরুষকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা ও স্মরণ করা উচিৎ। আমাদের দেশপ্রেমের নমুনা হতে পারে এই সাহসী ছোট্ট বালক লালু।

তথ্যসূত্রঃ  প্রথম আলো

ফেসবুকে লাইক দিন

Latest Tweets

তারিখ অনুযায়ী খবর

January 2021
FSSMTWT
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031