ইমরান-সালমান সম্পর্কে ফাটল, খুশি চীন-তুরস্ক
মুসলিম বিশ্বে সম্পর্কের ভাঙাগড়া চলছে তুমুল বেগে। এর সর্বশেষ উদাহরণ পাকিস্তান-সৌদি আরব বন্ধুত্ব। অনেকখানি ফাটল দেখা দিয়েছে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধনে।
সেই ফাটল সারাতেই পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া সৌদি আরব সফর করেছিলেন এ সপ্তাহে।
বিস্ময়করভাবে তিনি সৌদবংশের মূল ক্ষমতাধর মুহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। পাকিস্তানের জন্য এটা বিব্রতকর। বোঝা যাচ্ছে, সৌদি সরকার পাকিস্তানের ওপর চটেছে।
সৌদিদের ক্ষোভের বড় কারণ ওআইসি নিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য এবং ইরান, কাতার ও তুরস্কের সঙ্গে ইমরান খানের ঘনিষ্ঠতা।
পাকিস্তান-ইরান-কাতার-তুরস্কের মৈত্রীতে সৌদিরা ক্ষুব্ধ। দীর্ঘদিন থেকে পাকিস্তান চাইছে কাশ্মীর বিষয়ে ওআইসি বিশেষ বৈঠক ডাকুক। সৌদদের অনাগ্রহে সেটা হচ্ছে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহুমদ কোরেশি এ নিয়ে আগের সপ্তাহে এক টিভি টক শোতে মৃদু হুমকির সুরেই বলেছিলেন, মূল সংগঠকেরা বৈঠক না ডাকলে পাকিস্তানই আগ্রহী দেশগুলোকে নিয়ে এ রকম বৈঠক ডাকতে পারে।
কাশ্মীর বিষয়ে ওআইসির নিষ্ক্রিয়তায় পাকিস্তানের যে হতাশা, সেটাই এই মন্তব্যে প্রকাশ পেয়েছিল।
সৌদিরা মনে করছে, পাকিস্তানের এই ক্ষোভের প্রকাশ আসলে তুরস্কের ইন্ধনে। আঙ্কারার সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কের নাটকীয় উষ্ণতায় সৌদি আরব সুখী নয়।
বলা যায়, সৌদিদের সঙ্গে এরদোয়ানের দ্বন্দ্ব-সংঘাতেরই বলি রিয়াদ-ইসলামাবাদ সম্পর্কের এত দিনকার উষ্ণতা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইমরানের সঙ্গে কাতারের আমির ও মাহাথির মোহাম্মদের সুসম্পর্কের প্রতিক্রিয়া।
মাহাথির ও এরদোয়ানের কাশ্মীর নীতি এবং মুসলমানপ্রধান দেশগুলোকে আপন সম্প্রদায়ের স্বার্থে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টায় সৌদ রাজবংশের একদম সায় নেই।
সৌদদের ভয়, এতে ওআইসিতে তার পুরোনো প্রাধান্য থাকবে না। জোটটি ভেঙেও যেতে পারে। ইমরান খানের তুরস্কপ্রীতির প্রতিবাদ জানিয়েছে সৌদরা বেশ মোটাদাগে। দেড় বছর আগে তারা পাকিস্তানকে অর্থনীতি সামলাতে তিন বিলিয়ন ডলার দিয়েছিল।
সঙ্গে ছিল বাকিতে জ্বালানি তেল দেওয়ার ঘোষণা। হঠাৎ করেই তারা এখন সেসব ঋণের একাংশ ফেরত চাইছে। অভিমানী পাকিস্তান চীনের মদদে সঙ্গে সঙ্গে এক বিলিয়ন ডলার ফেরতও দিয়েছে। অতীতে এ ধরনের ঋণ মেয়াদ শেষে কমই ফেরত যেত।
সালমানের রাগ ভাঙাতে শেষ চেষ্টা ইমরানের
পাকিস্তানের জন্য সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ দেশ। সাহায্য-সহযোগিতার বিপুল উৎস ছাড়াও সৌদি আরবে রয়েছে পাকিস্তানের প্রায় ৩০ লাখ প্রবাসী।
অর্থনীতির চলতি দুঃসময়ে প্রবাসী এই শ্রমজীবীরা পাকিস্তানের জন্য বড় ভরসা। ফলে, সৌদদের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়েও সালমানের রাগ ভাঙাতে অনেকভাবে চেষ্টা করছে তারা।
ক্ষমতাধর সেনাপ্রধানকে রিয়াদ পাঠানো ছাড়াও ‘ডিপ স্টেইটে’র প্রধান জেনারেল ফয়েজ হামিদকেও পাঠানো হয়েছে সেখানে। কিন্তু সালমানের রাগ পড়েনি তাতে। সৌদিদের ওপর পাকিস্তানের বহুমাত্রিক নির্ভরতা সত্ত্বেও মাহাথির ও এরদোয়ানের সঙ্গে ইমরান যে হাত মিলিয়েছেন, তার পেছনে অর্থনৈতিকভাবে কাতার এবং রাজনৈতিকভাবে এরদোয়ানের কোনো আশ্বাস কাজ করে থাকবে; পাশাপাশি চীনের মদদ তো রয়েছেই।
তবে ইমরান খান কিছুটা পিছু হটতেও রাজি ছিলেন। সৌদদের রাগ-ক্ষোভ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁর বিরুদ্ধ শক্তিকে জ্বালানি জোগাতে পারে। সেই বিবেচনা ত্যাগ করছেন না ইমরান।
কেবল এই ভয়ে গত বছর মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ আহুত একটা সম্মেলনে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছিলেন তিনি।
